আব্দুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ ছাড়লেন ঢাকা অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : মে ১০, ২০১৯ ১০:৫৬:৪২ পূর্বাহ্ন
0

সারাদেশঃ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। একটি ছোট্ট ভাড়া বাড়ি থেকে কলেজটির সূচনা করেছিলেন অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা। মাত্র ৯৮ জন শিক্ষার্থী দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা। অনবদ্য প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ় অঙ্গীকারের বিনিময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই ৯৮ জন শিক্ষার্থীকে সংগ্রহ করেছিলেন। শিক্ষকদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়িয়েছেন তাদেরকে। সঙ্গে ছিলেন বেশ ক’জন সহযোদ্ধা এবং নরসিংদীর বেশ ক’জন বরেণ্য শিক্ষাবিদ।

PUB

বিশেষত, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী, প্রফেসর গোলাম মোস্তাফা মিয়া, অধ্যাপক প্রণব চক্রবর্তী, প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র সাহা, প্রফেসর পুলিন সাহা, প্রফেসর আব্দুর রহমান, প্রকৌশলী মোশারফ হোসেন, প্রফেসর আনোয়ারা বেগম, প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। কলেজ গড়ার জন্য স্বপ্নবান হয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়েছিলেন জনাব আবদুল কাদির মোল্লা। সেজন্য কলেজটির নামকরণ করা হয় আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ।

নিত্য নতুন সৃজনশীল ধারনা দিয়ে কলেজটির কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। যেমনÑ গাইড টিচার, হোম ভিজিট, বিশেষ পাঠ পরিচর্যা, রিকভারী ক্লাস, টিউটোরিয়াল পরীক্ষা এবং ক্লাস টেস্টের নিয়মিত আয়োজন ছিল কলেজে। রাত-দিন, দিন-রাত নিরন্তর, বিরতিহীন, ক্লান্তিহীন। সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন শৃঙ্খলা ও ছাত্র-শিক্ষক অকৃত্রিম সম্পর্ক তৈরি করা। শিক্ষার্থীর সাথে সম্বোধন ছিল আব্বা-আম্মা। নিজেকে তিনি শিক্ষার্থীর সন্তান দাবী করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নরসিংদীর জন্য নতুন ইতিহাসের সূচনা। সমগ্র বাংলাদেশে সেরা ফলাফলের জন্য আলোচিত বিদ্যাপীঠ আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। দেশের গ-ি পেরিয়ে যারা নরসিংদী প্রবাসী তাদের গর্বের ধন হয়ে উঠে আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। ড. মশিউর রহমান মৃধা হয়ে উঠেন জীবন্ত কিংবদন্তী।

নরসিংদী তখন সন্ত্রাসের জনপদ। খুন-খারাবি, মারামারি, মাদকে আচ্ছন্ন জেলা। সে সময় তিনি ভেবেছেন কেবল শিক্ষাই পারে মানুষকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে। শিক্ষাই পারে দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সুস্থ চর্চাই পারে নরসিংদীর অতীতের সব গ্লানি মুছে দিতে। ড.মশিউর রহমান মৃধা নরসিংদীর শিক্ষক সমাজকে নিয়ে শ্লোগান দিয়েছিলেনÑ‘শীঘ্রই স্বপ্ন জয়ের পালা, শিক্ষা সমৃদ্ধ নরসিংদী জেলা’। আজ তা বাস্তবায়নের পথে।

শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধারণ করা, অনুধাবন করা, শিক্ষার্থীর সামর্থ অনুযায়ী পাঠদান করা, শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করে রাখা, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে জীবন সম্পর্কে স্বপ্নবান করে গড়ে তোলা, শিক্ষার্থীর ধরণ, ধারন ক্ষমতা, সামর্থ, শিক্ষার্থীর চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির উপর সমধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষকতা কোন চাকরী বা পেশা নয় বরং নেশা। তিনি বলেন, শিক্ষকতা কারো অধীন নয়, সম্পূর্ণ বিবেকের অধীন। সে আলোকেই আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজকে সফলতার চূড়ায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ২০০৯ সাল হতে ২০১৮ পর্যন্ত একটানা শতভাগ পাস করার ইতিহাস বাংলাদেশে একমাত্র এই কলেজটির। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ঢাকা বোর্ডে ৫ম স্থান, ২০১০ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ এবং শতভাগ পাসসহ ৪র্থ স্থান। ২০১১ সালে ৭ম স্থান, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ সালে ঢাকা বোর্ডে তথা সমগ্র বাংলাদেশে ২য় স্থান অর্জন এবং ২০১৫, ২০১৬, ২০১৮ সালে সেরা ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয় ড. মশিউর রহমান মৃধার নেতৃত্বে আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ।

তিনি বরাবরই গতানুগতিক ধারার বাইরে আসার চেষ্টা করেছেন, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। তিনি সুন্দর আগামী, স্বপ্নময়, ভালোবাসাময় সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা শুনিয়েছেন শিক্ষার্থীদের। তিনি শিক্ষার্থীদের ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত হওয়ার আহ্বান জানাতেন নিয়মিত। শিক্ষকদের সৃজনশীল করে গড়ে তোলার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছেন। নিজেও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। নানারকম স্বীকৃতি পেয়েছেন।

বিশেষ করে ২০১৪ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ‘শিক্ষার জাদুকর’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৯ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ঢাকা অঞ্চলের তথা ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও জেলা প্রশাসনসহ নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে তাকে সম্মানসূচক স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। ড. মশিউর রহমান মৃধা বলেন, শিক্ষার্থীদের সন্তান ¯েœহে লালন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও সন্তানতুল্য মনে করতে হবে। তাই মনে করেছেন তিনি। শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি ছিলেন অন্তপ্রাণ। তিনি মনে করেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মনে চিরন্তনতার প্রতীক। শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ আশ্রয়স্থল, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত গড়ার সেতু।

ড.মশিউর রহমান মৃধা সকাল থেকে মধ্যরাত অব্দি প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, তার ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন-চিন্তা-দর্শন সবকিছুই ছিল আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজকে ঘিরে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিবিড় পরিচর্যা করেছেন নিবিষ্ট মনে। যার ফলে প্রত্যাশিত সফলতা পেয়েছেন তিনি। তিনি মনে করেন, শিক্ষা কোন পণ্য নয়, শিক্ষা অর্জনের বিষয়। শিক্ষা দূর্বৃত্তায়ন হতে পারে না, প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে পরাস্ত হতে পারে না। শিক্ষক হবেন মেরুদ-সম্পন্ন এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। আর এমনটি হলেই একজন শিক্ষক যুগযুগ বেঁচে থাকবেন তার স্বীয় কর্ম প্রতিভায়।

যে কলেজটিকে ঘিরে এতো স্বপ্ন, এতো সম্ভাবনা, এতো অর্জন সে কলেজটি ছিল তার স্বপ্ন বোনার মুক্ত জীবনের প্রাঙ্গণ। সেই কলেজ থেকে গত ০২ মে, ২০১৯ তারিখে বিদায় নিয়েছেন তিনি। কলেজ ছাড়ার বিষয়ে কোন আক্ষেপ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসা-যাওয়া মহাকালের চিরন্তন রীতি। আক্ষেপ নেই, মহান ¯্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা তিনি আমাকে অনেক সম্মান, মর্যাদা দিয়েছেন, ভালো রেখেছেন। এই ভেবে খারাপ লাগবে প্রিয় সহকর্মীদের মুখগুলো নিত্যদিন হয়তো আর দেখবো না, শিক্ষার্থীদের কলরব, পায়ের শব্দ, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় হয়তো সিক্ত হবো না। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, সবুজ মাঠ, নিজ হাতে লাগানো বৃক্ষরাজি বিশেষ করে মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে থাকা প্রখর রোদ্দুরে এক চিলতে ছায়া দেয়া কৃষ্ণচূড়া গাছটাও ভীষণ মিস করবো। এটা ভাবলেই কষ্ট হবে। সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ যখন মনে পড়বে কলেজ প্রাঙ্গণে কিংবা অফিস কক্ষে শিক্ষার্থীরা ঢুকে জড়িয়ে ধরতো কিংবা মাথায় হাত রাখার জন্য বলতো এবং চকলেট নিত। এগুলো পীড়া দিবে, হৃদয়ের গহীনে হানা দিবে, কষ্ট ও কান্নার কারণ হবে। শিক্ষার্থীদের সাথে আনন্দময়, মায়াময়, ভালোবাসাময়, স্বপ্নময় স্মৃতিগুলো খুবই মিস করবো।
ড. মৃধা বলেন, এই পর্যায়ে এসে মহান আল্লাহর দরবারে অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

তিনি বলেন, অপমান-অপদস্ত হওয়ার চেয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা কিংবা নিঃস্ব থাকা অনেক ভালো। কারণ জীবন দু’বার ব্যবহার করার সুযোগ নেই। তিনি সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন যাতে নরসিংদীর সম্মান বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির জন্য একজীবনে আরো কিছু কাজ করে যেতে পারেন।

সূত্রঃ গ্রামীণদর্পণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here