অনলাইন ডেস্কঃ হাওয়া ভবন থেকে মিন্টো রোড, মহাখালী থেকে স’চিবালয়, মন্ত্রীর দপ্তর থেকে বাসা—যুগের কিংবা স’রকারের বদল হলেও স্বা’স্থ্য খাতে ঠিকাদারি সা’ম্রাজ্যের গ’ডফাদার হয়েই আছেন মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। বিএনপি আমলে যেমন খোদ প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে ধ’রেছিলেন, তেমনি আওয়ামী লীগ আমলে একজন ম’ন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে ব’ন্ধুত্ব ও সখ্য গড়ে স্বা’স্থ্য খাতে য’ন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন গু’রুত্বপূর্ণ কেনাকা’টার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রেখেছেন বছরের পর বছর ধরে। গা বাঁচাতে সাত বছর ধরে কিছুটা প’র্দার আ’ড়ালে থেকে চালাচ্ছেন নিজের গড়া সি’ন্ডিকে’টের সব কিছু। থাকছেন কখনো দেশে, কখনো বা দেশের বাইরে। কেনাকা’টার বাইরে স্বা’স্থ্য খাতের স’রকারি পর্যায়ে বদলি-নিয়োগেও রয়েছে তাঁর সমান নিয়ন্ত্রণ। নিজের সিন্ডিকে’টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় জায়গাগুলোতে বসানো এবং অপছন্দের লোকদের অন্যত্র বদলি করানোর কাজও নিয়মিত করে ফেলছেন নানা প্র’ভাব খা’টিয়ে।

এমনকি এখন পা’লিয়ে থেকেও সি’ন্ডিকেট নি’য়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব কিছুই চা’লিয়ে যাচ্ছেন। স্বা’স্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে মিলেছে এমন তথ্য। গত ৩০ মে জনপ্রশাসনস’চিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে এই মিঠুসহ আরো বিভিন্ন পর্যায়ে স্বা’স্থ্য খাতের দু’র্নীতির বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় ঔষধাগা’রের (সিএমএসডি) সাবেক পরিচালক ব্রি’গেডিয়ার জে’নারেল মো. শহীদউল্লাহ। মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর একসময়ের ঘ’নিষ্ঠ এক সহযোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মিঠুর এত প্রভাবের খুঁটির জো’র কোথায়? সে কেন সব সময় ধ’রাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। এর জবাব মন্ত্রীদের ছেলেরাই মিঠুর ভরসা। তাই আমরা তাকে সব সময় ‘ছেলেধ’রা মিঠু’ বলেই ডাকতাম। কেবল স্বা’স্থ্যমন্ত্রীই নন, আরো কয়েকজন মন্ত্রীর ছেলেদের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে বাণিজ্যিক কারণেই।”

কিছুদিন আগে পর্যন্ত মিঠুর বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করা স্বা’স্থ্য ম’ন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রংপুরের গ’ঙ্গাচ’ড়ার মহিপুর এলাকার মিঠু বিএনপির আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের নি’য়ন্ত্রিত হাওয়া ভবনের সি’ন্ডিকে’টে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন স্বা’স্থ্য খাতের ঠি’কাদারি। ওই সময় নামে-বেনামে তাঁর সরবরাহকৃত অনেক যন্ত্রপাতি এখনো সারা দেশের জে’লা ও উপজে’লা পর্যায়ে অ’কেজো অবস্থায় পড়ে আছে, যা কখনোই ব্যবহার করা যায়নি। অনেক হাসপাতালে তখন প্রয়োজন না থাকলেও কিংবা ব্যবহারের জনবল ও অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও অনেক মূল্যবান য’ন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছিল।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ স’রকার ক্ষমতায় আসার পর কৌশলে একজন মন্ত্রীর ছেলের বন্ধু হয়ে মিঠু ঢুকে পড়েন মিন্টো রোডের বাসভবন থেকে শুরু করে ম’ন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর একান্ত কামরায়। বলা হয়ে থাকে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্বা’স্থ্য ম’ন্ত্রণালয়ের কেনাকা’টার সব কিছুই ছিল এই মিঠুর নিয়ন্ত্রণে। তৎকালীন ওই মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে মিলে প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, কোথায় কোন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হবে না হবে, প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে বিল তৈরি পর্যন্ত সব কিছুই বেশির ভাগ সময় মন্ত্রীর মিন্টো রোডের বাসায় অথবা মিঠুর অফিসে ঠিকঠাক হতো। ম’ন্ত্রণালয় ও স্বা’স্থ্য অধিদপ্তরে তাঁর সুবিধাভোগী কর্মচারীরা ফাইল নিয়ে ছোটাছুটি করতেন ওই দুই জায়গায়। যাঁরা তাঁকে সহায়তা করতে বিলম্ব করতেন কিংবা অপারগতা দেখাতেন তাঁদেরই পড়তে হতো বদলি বা বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় শা’স্তির কবলে। এসব প্রক্রিয়ায় দরপত্র তৈরি ও বিল প্রস্তুতের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দর দেখিয়ে চলত কেনাকা’টা। নিজের ১৫-১৬টি প্রতিষ্ঠানসহ সহযোগীদের নামে থাকা ঠিকাদারি লাইসেন্স দিয়ে চলত এসব দু’র্নীতির উৎসব।

ওই সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ স’রকারের ওই মেয়াদ পার হওয়ার পর ২০১৪ সালের নতুন মেয়াদে স’রকারের কার্যক্রম শুরু হলে দুদক সক্রিয় হয়ে ওঠে মিঠু সিন্ডিকে’টের দু’র্নীতি ও অনিয়মের বি’রুদ্ধে। একের পর এক মা’মলাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলে। সাবেক এক মন্ত্রী এবং তাঁর ছেলেও জড়িয়েছিলেন দুদকের মা’মলায়; যদিও পরে ওই মন্ত্রী ও ছেলে মা’মলা থেকে রেহাই পেয়েছেন।

আওয়ামী লীগের পরবর্তী মেয়াদে ম’ন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে সশরীরে যাতায়াত কমে যায় মিঠুর। এমনকি দুদকের মা’মলার পর গাঢাকা দেন তিনি। বেশির ভাগ সময় কাটে দেশের বাইরে। তবে ভেতরে ভেতরে নিজের সিন্ডিকে’টের লোকজনকে যতটা সম্ভব সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। পরে কিছুটা আড়ালে থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন মিঠু ও তাঁর সিন্ডিকেট। অ’ভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রেও বর্তমান একজন মন্ত্রীর ছেলেকে হাত করে সিন্ডিকেট সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। আর এরপরই সিন্ডিকে’টের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ঠিকাদার, কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে এক ধরনের ভাঙা-গড়া তৈরি হয়। পুরনো অনেককেই বাদ দিয়ে জায়গা দেওয়া হয় নতুন অনেককে। তাঁর রোষানলে পড়া পুরনো ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেমন অনেকে বদলি হয়েছেন আবার অনেকে বিভিন্ন ধরনের শা’স্তির আওতায় এসেছেন। শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, তাঁর পুরনো বিশ্বস্ত সহযোগী ঠিকাদারদের মধ্যে যাঁরা তাঁর বি’রোধিতা করেছেন তাঁরাও বিভিন্ন ধরনের চা’পের মধ্যে পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে ১৪ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে স্বা’স্থ্য অধিদপ্তর থেকে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই তালিকার মধ্যে যেমন মিঠু বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম নেই, তেমনি যাঁদের নাম আছে তাঁদের অনেকেই আগে মিঠুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা একই সিন্ডিকে’টে থাকলেও কোনো কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যদিও স্বা’স্থ্য ম’ন্ত্রণালয়ের চিঠিতে এই তালিকা দুদক থেকে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিঠুর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানায়, মিঠু বর্তমানে আমেরিকা ও সিঙ্গাপুর যাতায়াত করে সেখান থেকেই বাংলাদেশে তাঁর সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। তাঁর মূল প্রতিষ্ঠান লেক্সিকনের ঠিকানা পরিবর্তন করে গুলশানে নেওয়া হয়েছে। তাঁর এই অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও পরিবর্তন হয়েছে এর মধ্যেই। সেই সঙ্গে তাঁর পুরনো যে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে নানা দু’র্নীতির অ’ভিযোগ ছিল, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়ে অন্য নামে আরো কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন বলেও ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

স্বা’স্থ্য খাতের একাধিক সূত্র জানায়, মিঠুর একসময়ের ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত স্বা’স্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী আবজাল ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে অ’বৈধ আয় ও সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে দ্ব’ন্দ্ব শুরু হলে ফাঁ’স হয়ে যায় ওই দম্পতির প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মালিকানার বি’ষয়টি। দুদক ওই সূত্র ধরেই একে একে স্বা’স্থ্য ম’ন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের ৪৭ জনের বি’রুদ্ধে ত’দন্তকাজ শুরু করে। পরে পর্যায়ক্রমে কয়েকজনের বি’রুদ্ধে মা’মলা কার্যক্রম শুরু হয়। কয়েকজন গ্রে’প্তার হন, কেউ কেউ বদলি হন।

এসব বি’ষয়ে মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বক্তব্য নেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। গতকাল সোমবার রাতেও একাধিকবার তাঁর ফোন নম্বরে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।