ডাকাতির টাকায় বিপুল সম্পদ সেই এসআইয়ের

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : সেপ্টেম্বর 27, 2021 12:13:48 অপরাহ্ন
0
38
views

সারাদেশ: ডাকাতির মা’মলায় গ্রে’প্তার হয়ে কা’রাগারে থাকা পুলিশের অ’পরাধ ত’দন্ত বিভাগের (সিআইডি) উপপরিদর্শক আকসাদুদ-জামান ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও পোশাক কারখানার মালিক। চলতেন দামি গাড়িতে। ঠাকুরগাঁও শহরে ও গ্রামে তাঁর কয়েক কোটি টাকার জমি রয়েছে। ডাকাতির টাকা দিয়েই আকসাদুদ এসব সম্পদ করেছেন বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গো’য়েন্দা বিভাগের (ডি’বি) ত’দন্তে বেরিয়ে এসেছে।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর রাজধানীর কাওলায় সৌদিপ্রবাসীর বিদেশি মুদ্রা ও মালামাল ছি’নতাইয়ের ঘটনায় ডি’বির ত’দন্তে সম্প্রতি সিআইডির এসআই আকসাদুদের নাম আসে। ওই ঘটনায় ডি’বি পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৮ আগস্ট তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে সিআইডি। পরে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে জানিয়েছে মা’মলার ত’দন্তকারী সংস্থা ডি’বি। ৪ সেপ্টেম্বর মো. আকসাদুদ-জামানের স্ত্রীর সঙ্গে এক ব্যক্তির ১ কোটি ২৮ লাখ ও ১৪ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অডিও ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওই দিন রাতে রংপুরের মিঠাপুকুর থেকে আকসাদুদকে গ্রে’প্তার করে ডি’বি।

অডিওতে এক নারী বলছেন, ‘১ কোটি ২৮ লাখ তো নিছেন আপনারা সবাই। আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে ১৪ লাখ দিছি না?’ অপর প্রান্তে থাকা পুরুষ কণ্ঠও টাকা কোনো এক স্যারকে দেওয়ার কথা বলছেন। পরে জানা যায়, নারী কণ্ঠটি এসআই আকসাদুদের স্ত্রী তাহমিনা আক্তারের। তাহমিনার দাবি, অপর প্রান্তের কণ্ঠটি ডি’বির উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কায়সার রিজভী কোরায়েশির। তাঁর স্বামীকে ডাকাতি মা’মলা থেকে অব্যাহতি দিতে তিনি ওই টাকা ডি’বি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়েছিলেন। অবশ্য কায়সার রিজভী কোরায়েশী ঘুষ নেওয়ার অ’ভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডি’বি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেছেন, টাকা লেনদেনের বি’ষয়টি ত’দন্ত করা হচ্ছে। মা’মলার ত’দন্ত–সংশ্লিষ্ট ডি’বি কর্মকর্তারা বলেন, আকসাদুদ ডাকাতির পাশাপাশি বিভিন্ন অ’পরাধমূলক কর্মকাণ্ড চা’লিয়ে আসছিলেন। তিনি ২০১৩ সালে ডিএমপিতে কর্মরত থাকাকালে মতিঝিল অঞ্চলের একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে মাথায় অ’স্ত্র ঠেকান। এ ছাড়া কর্তব্যরত থাকাকালে আরেকবার শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন তিনি। এর দায়ে দুবার বিভাগীয় শা’স্তি ভোগ করেন আকসাদুদ।

মা’মলার ত’দন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আকসাদুদ সিপাহীবাগে পঞ্চমতলার যে ফ্ল্যাটে থাকেন, তা দুই বছর আগে ৮০ লাখ টাকায় কেনেন। ছয়-সাত বছর ধরে তিনি নিজের কেনা ব্যক্তিগত গাড়িতে চলতেন। ঢাকায় তাঁর তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজে’লার বালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আকসাদুদ ১৯৯৫ সালের ২৯ আগস্ট কনস্টেবল হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। ২০০২ সালে এএসআই হন তিনি। ২০১০ সালের ২৬ অক্টোবরে তিনি উপপরিদর্শক (এসআই) পদে পদোন্নতি পান। এরপর তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হতে থাকেন। আকসাদুদ ২০১৮ সালে সিআইডিতে বদলি হন।

প্রথম আলোর ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি আকসাদুদের গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানান, আকসাদুদ এসআই হওয়ার পর বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পাশে দুই একর জমি কেনেন। দুই বছর আগে সেখানে আরও ১৬ বিঘা জমি কেনেন। এই জমির বাজারদর দুই কোটি টাকা। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, ঠাকুরগাঁও শহরের তাঁতীপাড়ায় আকসাদুদের পৌনে দুই কোটি টাকার জায়গা রয়েছে। সম্প্রতি বালিয়ায় তিনি আরও ৩৭ শতাংশ জমি কেনেন।

ত’দন্ত সূত্রমতে, আকসাদুদ বর্তমানে সব মিলে ৫০ হাজার টাকা বেতন পান। এই টাকায় পরিবারের ভরণপোষণ চা’লিয়ে কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ডিএমপির ডি’বি সূত্র জানায়, সম্প্রতি আকসাদুদের একটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে সোর্স আমির তাঁকে ১২ লাখ টাকার ডাকাতি করার প্রস্তাব দেন। এ সময় আকসাদুদকে বলতে শোনা যায়, ২০ লাখের নিচে কোনো কাজ করবেন না। ডি’বি কর্মকর্তারা বলেন, বিমানবন্দর এলাকাকেন্দ্রিক সংঘটিত অধিকাংশ ডাকাতি আকসাদুদের নেতৃত্বে হয়েছে।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর সকালে বিমানবন্দর সড়কের কাওলায় দুবাইপ্রবাসী রোমান মিয়া ও তাঁর ফুফাতো ভাই মনির হোসেনকে ডি’বি পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের মা’রধর করে সঙ্গে থাকা পাঁচ হাজার মা’র্কিন ডলার, দুই হাজার দিরহাম, মুঠোফোন, কাপড়ভর্তি লাগেজসহ মালামাল ডাকাতি করে তাঁদের পাশের জঙ্গলে ফে’লে দেওয়া হয়। সৌদি আরবে রোমানের কাপড়ের ব্যবসা আছে। জমিজমা বিক্রি করে ওই টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য সৌদি আরবে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় করা মা’মলার ত’দন্তের দায়িত্ব পায় ডি’বি। সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির সহায়তায় কয়েক মাস আগে ছয় ডাকাতকে গ্রে’প্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে হাসান রাজার (চাকরিচ্যুত সে’নাসদস্য) আ’দালতে দেওয়া স্বী’কারোক্তিমূলক জ’বানব’ন্দিতে আকসাদুদের নাম আসে। ডাকাতিতে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের চালক হারুন অর রশিদ ওরফে সজীব, অটোরিকশাচালক জোনাব আলী এবং কায়ছার মাহমুদ ওরফে জাকির হোসেন সাক্ষী হিসেবে আ’দালতে জ’বানব’ন্দি দেন।

ত’দন্ত–সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, রি’মান্ডে আকসাদুদের ছয় সহযোগী জি’জ্ঞাসাবাদে ডি’বিকে বলেন, তিন বছর আগে আকসাদুদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়। তখন থেকে আকসাদুদের নেতৃত্ব তাঁরা ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধরনের অ’পরাধমূলক কর্মকাণ্ড চা’লিয়ে আসছিলেন। কয়েক মাস আগে আকসাদুদের ছয় সহযোগী জা’মিনে মুক্ত হয়েছেন। তাঁরা হলেন চাকরিচ্যুত সে’নাসদস্য হাসান রাজা, মোশাররফ হোসেন, সেলিম মোল্লা, রিপন মোড়ল, আমির হোসেন তালুকদার (পুলিশ সোর্স) ও রিজু মিয়া সিকদার। এঁদের মধ্যে হাসান রাজার বি’রুদ্ধে তিনটি ডাকাতির মা’মলা, সেলিম মোল্লার বি’রুদ্ধে চারটি ডাকাতির মা’মলা রয়েছে।

মা’মলার ত’দন্তকারী কর্মকর্তা ডি’বির উপপরিদর্শক মাকসুদুল ইসলাম বলেন, আকসাদুদ সিআইডির গাড়ি ডাকাতিতে ব্যবহার করতেন। প্রবাসীর অর্থ ডাকাতির ঘটনায় আকসাদুদসহ এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রে’প্তার করা হয়েছে। চ’ক্রের আরেকজন প’লাতক। মা’মলার ত’দন্ত শেষ হয়েছে। শিগগিরই এই মা’মলার অ’ভিযোগপত্র দেওয়া হবে।