পরীমনি কিংবা কাঠি লজেন্সে ছেলে ভোলানোর গল্প

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : আগস্ট 8, 2021 01:36:10 অপরাহ্ন
0
19
views

বিনোদন: একে কি আমরা চিত্রনায়িকা পরীমনির সৌভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করব? শতাব্দীর সবচেয়ে ভ’য়াবহ ম’হামা’রির কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে গোটা দেশের আলোচনায় থাকা কি চাট্টখানি কথা! বাংলা সিনেমার ইতিহাসের কোন রথী–মহারথী তারকার এমন সুযোগ হয়েছে? দুই দিন ধরে বাসা থেকে গলিতে বের হলে, সকালের নাশতা করতে হোটেলে ঢুকলে, চা খেতে টং দোকানে গেলে, ফেরিওয়ালার কাছে সবজি কিনতে গেলে কিংবা অফিসে আসতে রিকশায় উঠলে সর্বত্র একটাই নাম—পরীমনি। এর মধ্যে অবশ্য কারও কোনো স্বজন বা পরিচিতজনের মৃ’ত্যুসংবাদ নিয়েও শোক বা আফসোস কম হচ্ছে না। কিন্তু দেশের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম যেন পরীমনিকে নিয়ে নিজেদের রেটিং বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে। চিত্রনায়িকাই এখন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় সংবাদপণ্য।

এ জন্য আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত যে দিকে মনযোগ দিয়েছে, তা হচ্ছে, ‘গ্রাম থেকে’ উঠে আসা পরীমনির ‘উচ্চাভিলাষ’, ‘উচ্ছৃঙ্খল’ চলাফেরা বা তিনি কয়টি বিয়ে করেছেন— এসব দিকে। উপস্থাপন ভঙ্গিতে এটা স্পষ্ট যে এসব যেন অনেক বড় অ’পরাধ। আমাদের সমাজ বলি বা সিনেমার জগৎ বলি, সবই যেন এক পবিত্র জায়গা, সেখানে এমন সব কর্মকাণ্ড করে পরীমনি ভ’য়ংকরভাবে আইন ভঙ্গ করে ফে’লেছেন! তাঁকে গ্রে’প্তার অ’ভিযান, নিরাপত্তা বাহিনীর বিশাল বহর, শত শত উৎসুক মানুষের ঢলও যেন সেটাই প্রমাণ করে। কোথায় যেন খবরে দেখলাম, সেই ভিড়ের মধ্যে এক ফেরিওয়ালা নাকি মাস্ক বিক্রি করে কয়েক দিনের আয় কামিয়ে নিয়েছেন। সময়ের কাজ অসময়ে বা অসময়ের কাজ সময়ে করা আমাদের রাষ্ট্র বা স’রকারকে যেন বৃ’দ্ধাঙ্গু’লিই দেখিয়ে দিলেন তিনি।

ক’রোনায় প্রতিদিন এখন আড়াই শর মতো লোক মা’রা যাচ্ছে। পরিচিত বা আপন মানুষকে আমরা হা’রিয়ে ফেলছি। শেষবিদায়ে অংশ নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। এমন অ’সহায়ত্বের মধ্যে একের পর এক কথিত মডেল, নায়িকা বা তারকাকে নিয়ে একই ধরনের ঘটনা ‘উৎপাত’ ছাড়া কীই–বা হতে পারে। ‘রাতের রানি’ আখ্যা দিয়ে সেনসেশন তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু ‘রাতের রাজা’ কারা, তা কি আমরা জানতে পারব? নিরাপত্তা বাহিনীর একই ধরনের অ’ভিযান, একই ধরনের অ’বৈধ জিনিসপত্র উ’দ্ধার, একই ধরনের অ’ভিযোগ এবং একই ধরনের বক্তব্য নিয়েও হাস্যরসের শেষ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম একজন বললেন, সবার বাসায় থেকে উ’দ্ধার হওয়া ম’দের বোতলগুলোও একই হতে পারে! যদিও তা কী করে সম্ভব জানি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে নানা কৌতুকও হচ্ছে। কার বাসায় অ’ভিযান চা’লানো হলে কী মিলবে তা নিয়ে হাস্যরসও হচ্ছে। কেউ একজন কৌতুক করে লিখেছেন, নায়িকা শাবানার বাসায় অ’ভিযান চা’লানো হলে বিপুল পরিমাণ সেলাই মেশিন মিলবে।

আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত যে দিকে মনযোগ দিয়েছে, তা হচ্ছে, ‘গ্রাম থেকে’ উঠে আসা পরীমনির ‘উচ্চাভিলাষ’, ‘উচ্ছৃঙ্খল’ চলাফেরা, বা তিনি কয়টি বিয়ে করেছেন— এসব দিকে। উপস্থাপন ভঙ্গিতে এটা স্পষ্ট যে এসব যেন অনেক বড় অ’পরাধ। আমাদের সমাজ বলি বা সিনেমার জগৎ বলি, সবই যেন এক পবিত্র জায়গা, সেখানে এমন সব কর্মকাণ্ড করে পরীমনি ভ’য়ংকরভাবে আইন ভঙ্গ করে ফে’লেছেন!

ম’হামা’রিতে এমন সব তামাশায় মেতে আছি আমরা। ফলে পরীমনিকে আ’টকের দিনই প্রথম আলোতে একটি বাক্‌রুদ্ধ খবর আমাদের মনোযোগ পায় না। বিয়ের ৯ বছর পর মা হয়েছিলেন লাবণী রায় নামে এক নারী। ক’রোনা জটিলতা দেখা যাওয়ায় মেয়ে জন্ম দিয়েই তাঁকে যেতে হলো আইসিইউতে। লাবণীর বুক থেকে দুধ চিপে নিয়ে মেয়েকে খাওয়ান নার্স। এত বছর প্রতীক্ষা ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর মা হয়েছিলেন লাবণী। মেয়েকে কোলেই নিতে পারলেন না তিনি, ঠিকঠাক দেখতেও পারল না। আইসিইউ থেকে ফেরা হলো না তাঁর। মেয়ের জন্মের পরপর নাম বলে যান—‘স্পৃহা’। একটি স’ন্তানের জন্য কী স্পৃহা বা আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটাই মেয়ের নামের মধ্যে বলে গেলেন লাবণী। গতকাল আরেক খবরে জানা হয়ে গেল, গোটা দেশে বাবা বা মা হা’রিয়ে এতিম হয়ে গেছে সাড়ে তিন হাজার শি’শু। সেটিও আমাদের অনেকের নজর কাড়েনি নিশ্চিত।

সেদিন দেশের সবচেয়ে আলোচনার খবর হতে পারত এক বজ্রপাতেই একসঙ্গে ১৭ জন বরযাত্রীর মৃ’ত্যুর ঘটনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মাপাড়ে যে নৌকা করে বর–কনেকে আনতে গেলেন, সেটি করেই লা’শ হয়ে ফিরত হলো। সারি করে খোঁড়া কবরেই দাফন হলো তাঁদের। দেশে বজ্রপাতের এক ঘটনায় কখনো এত মানুষের মৃ’ত্যু হয়েছিল কি না জানা নেই। উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে হইচই পড়ে যেত এমন ঘটনায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে কেন শতাধিক করে মানুষের মৃ’ত্যু হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা নেই। ২০১৬ সালে তিন শতাধিক মৃ’ত্যুর পর বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দু’র্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল স’রকার। এরপর বজ্রপাত রোধে বিশেষ পরিকল্পনা এবং সতর্কীকরণ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছিল জানি। এর জন্য জ্ঞান অর্জন করতে কর্মকর্তাদের পাঠানো হয় বিদেশ সফরে। ফিরে এসে তাঁরা কত দূর কী করলেন, তা–ও জানি না। কারণ, এসব নিয়ে আলোচনায় আমাদের কারও কোনো আগ্রহ নেই।

একইভাবে বলতে হয়, গ্রে’প্তার–আ’তঙ্কে স্বল্প বসনে লাইভে আসা পরীমনির ভিডিও নিয়ে হাসিঠাট্টা করা অবদমিত মানুষের কিছু আসে–যায় না একজন লিলি বেগম বা হাসানুজ্জামানের কা’ন্নায়। সেদিন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় আ’গুনে পু’ড়ে মা’রা যাওয়া শ্র’মিকদের মৃ’তদেহ। হাসানুজ্জামানেরা কফিন জড়িয়ে বলে ওঠেন, ‘লা’শ কই, সবই তো কঙ্কাল।’ কয়েক দিন আগে জানা গেল, সেই আ’গুনে পু’ড়ে মা’রা যাওয়া ৫২ জনের ১৩ জন ছিল শি’শু শ্র’মিক। লিলি বেগমরা স’ন্তানের লা’শ বুঝে পাওয়ার আগে কত সহজে জা’মিন নিয়ে বেরও হয়ে গেলেন কারখানার মালিক। লা’শ দাফনের জন্য জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হলো। কিন্তু মৃ’ত শ্র’মিকদের ক্ষ’তিপূরণ কী হবে, কে দেবে—কী হবে সেসব জেনে!

গত দেড় বছরে স্বা’স্থ্য খাতে এত অনিয়ম, দু’র্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কিছুই ঠেকানো গেল না। কারও বি’রুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশ্বের কত দেশে স্বা’স্থ্যকর্তাদের বরখাস্ত বা পদত্যাগের ঘটনা দেখা হয়ে গেল। আর আমরা হাজার হাজার মানুষের মৃ’ত্যু বাড়িয়ে নির্লজ্জই থেকে গেলাম।
সেদিনের আরও একটি খবর নিয়ে আমাদের উ’দ্বি’গ্ন হওয়ার কথা ছিল। ডেঙ্গুতে মা’রা গেছে ঢাকার এক সাংবাদিকের দশ বছর বয়সী ছেলে। আগস্টের প্রথম চার দিনেই সহস্রাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আ’ক্রান্ত, এই খবরও। এখন পর্যন্ত মা’রা গেছেন দশজন, যার মধ্যে পাঁচজনই শি’শু। এক ম’হামা’রির মধ্যে আরেক রো’গের সং’ক্র’মণে মানুষ মা’রা যাচ্ছে। আমরা বুঝতেও পারছি না। আমরা ভু’লে গেছি, দুই বছর আগে ঠিক এই সময়ে ভ’য়াবহ ডেঙ্গু ম’হামা’রির ঘটনা। ২০১৯ সালে শুধু স’রকারি হিসেবে মা’রা গিয়েছিল প্রায় ২০০ মানুষ। এবারও পরিস্থিতি তেমন হলে একসঙ্গে দুটি ম’হামা’রি কীভাবে সামাল দেব, সেই ভাবনাও কারও মধ্যে নেই।

পরীমনির বাসায় অ’ভিযানের দিন সকালে বগুড়ায় লা’শের অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে সড়ক আ’টকে দিয়েছিলেন পরিবহনশ্র’মিকেরা। সেই অ্যাম্বুলেন্সে ছিল তাঁদেরই এক সহকর্মী মোহাম্ম’দ লিটনের লা’শ। ঢাকায় পুলিশি হেফাজতে আত্মহ’’ত্যা করেছেন তিনি। পরিবারসহ শ্র’মিকদের অ’ভিযোগ, রি’মান্ডে নি’র্যাতন করে তাঁকে মে’রে ফেলা হয়েছে। তাঁকেও মা’দক নিয়ে গ্রে’প্তার করা হয়েছিল। রি’মান্ড বা পুলিশি হেফাজতে মৃ’ত্যু নিয়ে কিছুই বলতে চাই না। শুধু বলব, একটা সভ্য রাষ্ট্র আমরা কবে হতে পারব!

বিধিনিষেধ নিয়ে একের পর এক তামাশা তো দেখা হলো। গণটিকা কার্যক্রম নিয়েও সেটি শুরু হয়ে গেছে। গত দেড় বছরে স্বা’স্থ্য খাতে এত অনিয়ম, দু’র্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কিছুই ঠেকানো গেল না। কারও বি’রুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশ্বের কত দেশে স্বা’স্থ্যকর্তাদের বরখাস্ত বা পদত্যাগের ঘটনা দেখা হয়ে গেল। আর আমরা হাজার হাজার মানুষের মৃ’ত্যু বাড়িয়ে নির্লজ্জই থেকে গেলাম। এর বাইরেও প্রতিদিন কত কিছু ঘটে যাচ্ছে, কত কা’ন্না ঝরছে। নায়িকার বাসায় পাওয়া ম’দের বোতলে আমরা সবকিছু ভু’লে যাই কিংবা ভু’লিয়ে দেওয়া হয়, কাঠি লজেন্সে ছেলে ভোলানো গল্পের মতো।

লেখক: রাফসান গালিব, প্রথম আলো’র সহসম্পাদক।