‘আল্লামা’র বহুবিবাহ, ‘কাব্যের উপেক্ষিতা’ ও ডিমের দোকান

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : এপ্রিল 20, 2021 12:01:15 পূর্বাহ্ন
0
42
views

ছোটবেলায় খেলতে বাইরে যাবার সময় মা কখনো টাকা দিয়ে বলতেন – “যদি দোকান খোলা পাও তবে ডিম কিনে এনো”। দোকান খোলা পেলে আমি ডিম কিনতাম, বন্ধ থাকলে কেনা সম্ভব হতোনা।

“যদি” ও “তবে”-র এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কটা মাথায় রেখে চলুন সামনে এগোই।

হুলুস্থুল হয়ে যাচ্ছে আল্লামা মামুনুল হককে নিয়ে। তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাস’চিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাস’চিব সহ অনেকগুলো প্রকাণ্ড কুরসি অলংকৃত করেন। ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’কে নিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়্যাল রিসোর্টে গেলে তাকে ‘অন্যায়ভাবে’ অ’বরুদ্ধ করা হয়। সেই থেকে তাকে নিয়ে নিত্যনতুন খবরে পত্রিকা, ফেইসবুক, বাংলাদেশি ইউটিউব চ্যানেলগুলো ভাতের হাঁড়ির মতো টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু ঘটনার ঝড়ে অন্তরালে রয়ে গেছে তার অভিজাত বংশের প্রথমা স্ত্রী ব্যক্তিত্ব-সম্পন্না আমিনা তৈয়েবা-র অশ্রু, দুঃখ এবং ক্ষো’ভ। তিনি প্রথমে আল্লামা-র দ্বিতীয় (এবং তৃতীয়??) বিয়ের কথা জানতেনই না কারণ ‘শারিয়া মোতাবেক সেটা তার জানবার অধিকারই নেই, অনুমতি বা বা’ধা দেওয়া তো দূরের কথা’। তাই তাকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেন নি আল্লামা। তার স্তম্ভিত ক্ষু’ব্ধ স’ন্তানেরা দেখল, যে মায়ের পায়ের নীচে তাদের বেহেশত সেই মায়ের ঘরে সতীন/রা এসেছে কিন্তু তিনি তা জানারও অধিকার রাখেন না। কবিগুরুর ঊর্মিলার মতো, প্রিয়ংবদা আর অনসূয়ার মতো, পত্রলেখার মতো তিনি নিভৃত অশ্রুসিক্তা “কাব্যের উপেক্ষিতা”।

“যদি” এটা হয় “তবে” ওটা করবে, এটা একটা অবিচ্ছেদ্য শর্তসাপেক্ষ ক্রিয়া যার একটাকে অন্যটা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়না। কোরান এ অবিচ্ছেদ্য শর্তসাপেক্ষে বহুবিবাহকে বৈধ করেছে সূরা নিসার আয়াত ৩-এ তে:- “যদি তোমরা ভ’য় কর যে এতিম মেয়েদের হক যথাযথভাবে পূরণ করিতে পারিবে না তবে সেইসব মেয়েদের মধ্য হইতে যাহাদিগকে ভাল লাগে তাহাদিগকে বিবাহ করিয়া নাও দুই, তিন বা চারিটি পর্যন্ত।”। স্পষ্টতই বহুবিবাহের অনুমতিতে এতিম’দের জ’ড়িত থাকার এ অবিচ্ছেদ্য কোরানের শর্তটা মানুষ সৃষ্ট হরেকরকম দলিল ও ব্যাখ্যা দ্বারা বেমালুম গায়েব করা হয়েছে। আমার কথা নয়। আমীর আলী, মওলানা ওমর আহম’দ ওসমানী, এ ভি মীর আহমেদ, জাস্টিস আফতাব হোসেন ইত্যাদি অনেক ইসলামী বিশেষজ্ঞের কথা এটি। সতীনের সংসার মানেই নরক। কোরান সেই নরক বৈধ করেছে একটা তাৎক্ষণিক স’মস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে, চিরকালীন নয়। নিসা ৩-এর আগেপরের আয়াতগুলোতে এতিমের স্বার্থরক্ষায় কোরানের ব্যাকুলতা সুস্পষ্ট। ওহুদ যু’দ্ধে অনেক সাহাবী নি’হত হলে অনেক এতিম হয়েছিল যাদের স্বার্থরক্ষার দরকার ছিল। দলিল জানাচ্ছে –

আয়েশা (রাঃ)-কে আয়াতটি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলিলেন − অনেক সময় এতিম মেয়ে ধনশালী ও সুন্দরী হইলে অভিভাবক নিজেই উপযুক্ত মোহর না দিয়া তাহাকে আপনার হওয়ার সুবাদে বিবাহ করে, কিন্তু এতিম বালিকা ধনবান না হইলে বা সুন্দরী না হইলে সেইরূপ করে না। এ অন্যায় রহিত করণার্থেই এ আয়াত নাজিল হইয়াছে” – বাংলাদেশ লাইব্রেরি প্রকাশিত আবদুল করিম খানের সঙ্কলিত সহি বোখারি হাদিস ২৪২৮।

কাজেই, যেখানে এতিম’দের ও’পরে ‘এ অন্যায়’ নেই, সেখানে কোরানের বহুবিবাহের নির্দেশ খাটেনা, এ সিম্পল সত্যটা বুঝতে আইনস্টাইন হতে হয়না। একই হাদিস আছে ড. মুহসিন খানের বোখারি-অনুবাদ ৭ম খণ্ড, হাদিস ৩৫, ৫৯ ও ৬২। একারণেই স্বয়ং রসূল (স) হযরত আলীকে (র) দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেননি, একবার নয় দু দুবার– একবার আবু জেহেলের কন্যাকে আরেকবার হিশাম ইবনে মুগীরার কন্যাকে। কারণ দু কন্যার কেউই এতিম ছিলনা। দেখু’ন একই বাংলা-সহি বোখারি:

হাদিস ২৪৭২− আলী (রা.) আবু জেহেলের কন্যাকে বিবাহ করার পয়গাম পাঠাইয়াছে জানিতে পারিয়া ফাতেমা (রা.) রসুলুলাহ (দ.)-এর নিকট গিয়া বলিলেন − আপনার আত্মীয়স্বজনগণ বলিয়া থাকে যে আপনি আপনার মেয়েদের পক্ষ হইয়া একটু রাগও দেখান না। ওই দেখু’ন আলী (রা.) আবু জহলের কন্যাকে বিবাহ করিতে চাহিতেছে। রসুলুলাহ (দ.) বলিলেন – ‘নিশ্চয় ফাতেমা আমার কলিজার টুকরা। তাহার ব্য’থায় আমি ব্যথিত হই। নিশ্চয়ই আমি হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করিতে চাহি না। অবশ্য এই কথা বলিতেছি যে, আল্লাহর কসম! আল্লাহর রসুলের কন্যা এবং আল্লাহর শ’ত্রুর কন্যা একই ব্যক্তির বিবাহে একত্রিত হইতে পারিবে না। এই ভাষণের পর আলী (রাঃ)বিবাহের প্রস্তাব পরিত্যাগ করিলেন।”

এটা আছে মুহসিন খানের অনুদিত বোখারী ৪র্থ খণ্ড হাদিস ৩৪২ ও ৫ম খণ্ড হাদিস ৭৬ ও ৭ম খণ্ড ১৫৭।

হাদিস ২৪৭৩– হজরত মেসওয়ার ইবনে মাখরামা (রা.) জানাচ্ছেন- “আমি রসুলুলাহ ((স)-কে মিম্বরে বসিয়া বলিতে শুনিয়াছি − হিশাম ইবনে মুগীরা আলী ইবনে আবু তালেব (রা.)-এর নিকট তাহার মেয়ে বিবাহ দেওয়ার জন্য আমার নিকট প্রস্তাব করিয়াছে। কিন্তু আমি অনুমতি দিই নাই এবং আলী (রা.) আমার কন্যা ফাতেমা (রা.)কে তা’লা’ক না দেওয়া পর্যন্ত আমি অনুমতি দিব না। কেননা ফাতেমা হইতেছে আমার শরীরের অংশ। আমি ঐ জিনিস ঘৃণা করি যাহা সে ঘৃণা করে এবং তাহাকে যাহা আ’ঘাত করে তাহা আমাকেও আ’ঘাত করে।”

হাদিসটা পাবেন, ম’দিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মহসিন খানের অনুদিত সহি বুখারি, ৭ম খণ্ড, ১৫৭।

ইচ্ছে হলেই বহুবিবাহ করা যাবে এটা কোরানের নির্দেশ হলে রসূল (স.) ও বিবি ফাতেমা (র.) হযরত আলীর বহুবিবাহের বি’রুদ্ধে দাঁড়াতে পারতেন? না, পারতেন না। দুনিয়ার প্রতিটি মু’সলিম নারী বিশ্বনবীর (স) কলিজার টুকরা। তিনি তার অনাগত অগণিত সমস্ত কলিজার টুকরাকে সতীনের সম্ভাবনায় ঠেলে দেবেন এবং নিজের মেয়েকে রক্ষা করবেন এমন ব্যাখ্যা তার মর্যাদার খেলাফ। অথচ আমরা সেটাই করছি যা উনি করেননি, ইচ্ছে হলেই বহুবিবাহ – তার ভাষায় “হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল”।

নিসা ১২৯ ও ১২৭-তেও আছে একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে কেউই সমতাপূর্ণ আচরণ করতে পারবে না এবং বহুবিবাহের বিধানটা অবশ্যই এতিম সংশ্লিষ্ট। ইসলাম সিরাতুল মুস্তাকিম অর্থাৎ সহজ সরল পথ। বহু আয়াতে আছে কোরান সুস্পষ্ট কেতাব। এ সহজ সরল পথ-এর সুস্পষ্ট কেতাবের সুস্পষ্ট নির্দেশটা উল্টে দেবার জন্য আমরা কত পরিশ্রমই না করেছি, কত যুক্তি কত দলিলই না দেখাচ্ছি! নারীর সংখ্যা নাকি পুরুষের বেশি। কত বেশি? চারগুণ? তিনগুণ? দ্বিগুণ? আসলে এর ধারেকাছেও তো নয়! ইন্টারনেটে “Human sex ratio” সার্চ করলেই পাওয়া যাবে প্রকৃতি তার ভারসাম্য ঠিকই বজায় রেখেছে, পুরুষের শি’শুমৃ’ত্যু, যু’দ্ধ বা দু’র্ঘটনায় মৃ’ত্যু সবকিছু ধরার পরেও দুনিয়ায় অন্যান্য প্রা’ণীর মতোই পুরুষ-নারী মোটামুটি সমানে সমান।

“Like most sexual species, the sex ratio in humans is close to 1:1. In humans, the natural ratio between males and females at birth is slightly biased towards the male sex, being estimated to be about 1.05 or 1.06 or within a narrow range from 1.03 to 1.06 males/per female born”.

এর পরেও “যুক্তি” দেখানো হয় নারীরা স’ন্তান জন্ম’দানে অক্ষম হতে পারে, এমন অসুখ হতে পারে কিংবা মাসে এক সপ্তাহ এবং বাচ্চা জন্ম দেবার ব্যাপারে লম্বা সময় ধরে সংসর্গ সম্ভব নয়, পুরুষের “চাহিদা” নাকি নারীর চেয়ে ৯৯গুণ বেশি, বহুবিবাহ পাশ্চাত্যে যৌ’নতার প্লাবনের চেয়ে ভালো ইত্যাদি। আমার মনে হয়না এগুলো নিয়ে আলোচনার দরকার আছে, দুটো ছাড়া।

(১) নারীরা স’ন্তান জন্ম’দানে অক্ষম হতে পারে: এক্ষেত্রে ইসলামের বৈধ পদ্ধতি ইজতিহাদ তো আছেই, এক্ষেত্রে স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি তো দেওয়া যেতেই পারে। কিছু মু’সলিম দেশে এ আইন আছেও, আমাদের স’রকারেরও এ আইন করা উচিত। প্রতিটি বিবাহিতা মু’সলিম নারীর জীবন ও সম্মান আজীবন তার স্বামীর মর্জির ও’পরে ঝুলে থাকবে এটা কোনো কাজের কথা নয়।

(২) পাশ্চাত্যে যৌ’নতার প্লাবন: পরাক্রমশালী প্রযুক্তির ফলে যৌ’নতার প্লাবন এখন বিশ্বগ্রাসী, বহুবিবাহ দিয়ে সেটা ঠেকানোর প্রশ্নই ওঠেনা। দীর্ঘকাল মধ্যপ্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে বাস করার অভিজ্ঞতায় আমি জানি ওদের অবস্থা পাশ্চাত্যের চেয়ে মোটেই ভালো নয়।

নারীবান্ধব বহুবিবাহের আইন দেখাচ্ছি প্রাচীন সভ্যতা আসিরিয়ান এবং ব্যাবিলনিয়ান হাম্মুরাবী আইন থেকে:-

(ক) স্ত্রী যদি স’ন্তানধারণ করিতে পারে তবে স্বামী তাহাকে তা’লা’ক দিতে পারিবে না।

(খ) স্ত্রী যদি স’ন্তানধারণ না করে তবে স্বামী তাহার স্ত্রীকে তা’লা’ক দিতে পারিবে কিন্তু স্বামী তাহাকে ঐ সকল কিছুই ফিরাইয়া দিবে যাহা কিছু সেই স্ত্রী বিবাহকালে আনিয়াছিল, এবং সারাজীবন স্ত্রীর খরচ বহন করিবে।

(গ) স্ত্রী যদি স’ন্তানধারণ না করে তবে সে স্বামী বিবাহ করিতে পারে কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রী কোন ব্যাপারেই মর্যাদায় প্রথম স্ত্রীর সমান হইবে না…

সূত্র: – “ড্রাইভার অ্যাণ্ড মাইলস”-এর “ল’জ ফ্রম মেসোপটমিয়া অ্যাণ্ড এশিয়া মাইনর” এবং ওমস্টেড-এর “হিস্ট্রি অব্ আসিরিয়া”- আইনের অধ্যাপক ডঃ আনোয়ার হেকমত-এর “উইমেন অ্যাণ্ড দ্য কোরাণ”পৃঃ ১৫৩ ও ২৪১-২৪৩।

নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে ইতিহাসের শুরু থেকে পুরুষতন্ত্র অত্যন্ত ধূর্ততা, দক্ষ’তা ও সাফল্যের সাথে কাজে লাগিয়েছে প্রথা, সাহিত্য, সংগীত, পোশাক, খাদ্য, আইন, ধর্ম ইত্যাদি যা কিছু পেয়েছে। তাই আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। যে মায়ের পায়ের নিচে স’ন্তানের বেহেশত তিনি কেন স’ন্তানের বিয়েতে অভিভাবক তো দূরের কথা সাক্ষী পর্যন্ত হতে পারবেন না- সে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলতে হবে।

১৪০০ বছর ধরে আমরা বন্ধ দোকান থেকে ডিম কিনেছি। কোন প্রা’ণীর ডিম কিনেছি তার প্রমাণ আছে লক্ষ কোটি “কাব্যের উপেক্ষিতা” আমিনা তৈয়েবা-দের নিভৃত অশ্রুস্রোতে, অ’পমানে আর ক্ষো’ভে। সূত্রঃ বিডি নিউজ২৪