‘তে’জি’ হে’ফাজতের লা’গামে টা’ন

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : এপ্রিল 19, 2021 10:35:05 অপরাহ্ন
0
18
views

রাজনীতি: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে গত ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনের বিরোধিতায় এক সপ্তাহ আগে থেকে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। করেছেন ছোটখাট বিক্ষোভও। কিন্তু তাদের ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায় নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসার পর। স্বাধীনতা দিবসে অর্থাৎ ২৬ মার্চ একেবারে প্রকাশ্যে বিক্ষোভের ডাক দেন তারা। এই বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঢাকায় আহত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ঝরে চার প্রাণ।

এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস আন্দোলন হতে থাকে। একপর্যায়ে হেফাজত ২৮ মার্চ হরতাল ডাকে। আবার এই হরতাল ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা। দেশের সরকারি বিভিন্ন দফতর, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যালয় কিংবা নেতাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকর্মীর প্রাণহানিও হয়েছে। সরকারও পরিকল্পিতভাবে থামায় হেফাজতের এ আন্দোলন।

এর কয়েকদিন পর ঘটে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড। ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীসহ কতিপয় লোকজনের কাছে অবরুদ্ধ হন মামুনুল। খানিকবাদে সেই রিসোর্টে হামলা-ভাঙচুর করে মামুনুলকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান হেফাজতের নেতাকর্মীরা। পরে সেই ঘটনায় একাধিক মামলা হয় হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সেই ঘটনাপ্রবাহ গড়ায় বহুদূর। দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম সংসারের ছেলে তার মায়ের বিয়ে বিচ্ছেদের পেছনে মামুনুল হককে অভিযুক্ত করেন। এরপর মামুনুলের তৃতীয় বিয়ের খবরও পাওয়া যায় মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা এক সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি)। এ নিয়ে ব্যাপক ইমেজ সংকটে পড়ে হেফাজত।

এর মধ্যে হেফাজতের বিষয়ে নড়েচড়ে বসে সরকার। ১ এপ্রিল হেফাজতের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলামসহ ৫৪ নেতা-কর্মীর ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সচল করা হয় মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৭-৮ বছর আগের পুরনো মামলা। এসব মামলায় প্রথমে কর্মীদের, পরে স্থানীয় থেকে মধ্যম সারির নেতাদের এবং সর্বশেষ কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করছে সরকার। এদের মধ্যে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, ঢাকা মহানগরের সভাপতি এবং হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব, সহকারী মহাসচিব মঞ্জুরুল হক আফেন্দি ও সাখাওয়াত হুসাইন রাজীসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা রয়েছেন।

এছাড়া হেফাজতের মূল ঘাঁটিখ্যাত চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের পর গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর হেফাজতের তৎকালীন আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর ঘটনায় যে মামলা হয়েছিল, সেটিতে পরবর্তীকালে আমিরের দায়িত্ব পাওয়া জুনায়েদ বাবুনগরীসহ ৪৩ জন নেতাকে অভিযুক্ত করে ১২ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কিছু নেতাকে গ্রেফতারের কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় হেফাজতের সার্বিক অবস্থা বুঝতে পেরে সর্বশেষ গত রোববার (১৮ এপ্রিল) সংগঠনটির সবচেয়ে মাঠ গরম করা নেতা মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়। সোমবার (১৯ এপ্রিল) একটি নাশকতর মামলায় তাকে সাত দিনের রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। এদিনই সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, হেফাজতের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২৩ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

যদিও মামুনুলকে গ্রেফতারের পর রোববার রাতেই অনলাইনে জরুরি বৈঠকে বসেন হেফাজত নেতারা । কিন্তু এই বৈঠকে কোনো সমাধান মেলেনি বলে সূত্রে জানা গেছে। উল্টো বৈঠক শেষে অধিকাংশ হেফাজত নেতা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। তবে হেফাজত আমির জুনায়েদ বাবুনগরী খুব শিগগির লাইভে আসতে পারেন অথবা গ্রেফতার নিয়ে বিবৃতি দিতে পারেন বলে জানা গেছে।

টাইমলাইন ঘেঁটে যেখানে একসময় হেফাজতকে সবচেয়ে ‘তেজি’ বিরোধী সংগঠন মনে হয়েছে, এই এপ্রিলে কেমন যেন চুপসে গেছে সংগঠনটি। বিশেষ করে গত ২৬-২৭-২৮ মার্চও যে হেফাজতের নেতাদের হুংকার দিতে দেখা গেছে, মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় সেই হেফাজত যেন দিগভ্রান্ত-দিশেহারা হয়ে পড়েছে। সেই নেতাদের অনেকে এখন কারাগারে, অনেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে থাকছেন আড়ালে।

কেন এমন চুপসে গেছে হেফাজত? সংশ্লিষ্টরা এর ভিন্ন ভিন্ন কারণ বলছেন। কেউ বলছেন, হেফাজতের সাবেক আমির আহমদ শফীর জীবদ্দশায় সংগঠনে তার একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল। পুরো কওমি ঘরানার আলেম-ওলামাদের মধ্যে তার প্রভাব ছিল। তার মৃত্যুর পর দুর্বল হয়েছে হেফাজতের নেতৃত্ব। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে অনেকটা দুভাগে বিভক্ত হয়েছে সংগঠনটি। একটির নেতৃত্ব দেন আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী, অপরটির নেতৃত্ব দেন জুনায়েদ বাবুনগরী। যদিও কওমি অঙ্গনের বেশিরভাগ নেতা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতকেই মূলধারার সংগঠন মনে করে থাকেন।

তবে সবমিলিয়ে বর্তমানের হেফাজত যে আগের হেফাজতের চেয়ে অনেক দুর্বল, সেটা একবাক্যে স্বীকার করছেন কওমি অঙ্গনের অনেকেই। এটার কারণ হিসেবেও ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন তারা।

কেউ কেউ মনে করছেন, জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান যে হেফাজতের কমিটি আছে, সেখানে মামুনুল ইস্যুতে একপ্রকার মতবিরোধ চলছে। মামুনুল ইস্যুর আগে হেফাজত ঠিকই শক্ত অবস্থানে ছিল। কিন্তু মামুনুলের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হেফাজত ভুল করেছে। এসবের কারণে দেশব্যাপী হেফাজত ইমেজ সংকটে পড়েছে।

জানা গেছে, কিছুদিন আগে মামুনুলের বিষয়ে হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে একাধিক নেতা মামুনুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেন। কিন্তু মামুনুলপন্থী নেতাদের বিরোধিতার কারণে সেই দাবি ভেস্তে যায়। যুক্তি হিসেবে মামুনুলপন্থী নেতারা বলেছেন, মামুনুলের বিরুদ্ধে এখন ব্যবস্থা নিলে সরকার তাকে গ্রেফতার করতে পারে।

আবার রোববার মামুনুল হক গ্রেফতার হওয়ার পর এখন তার অনুরাগী নেতাদের দোষারোপ করছেন হেফাজতের বেশ কয়েকজন নেতা। তারা বলছেন, হেফাজত ব্যবস্থা না নিলেও সরকার কিন্তু ঠিকই তাকে গ্রেফতার করেছে। উল্টো এই দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী হেফাজতের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করছে সরকার। সবমিলিয়ে সরকার সুকৌশলে এগিয়ে হেফাজতকে একপ্রকার কোণঠাসা করে ফেলেছে।

চট্টগ্রামে দায়িত্বরত কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নেতৃত্ব নিয়ে হেফাজতের দ্বিধাবিভক্তি যে জায়গায় পৌঁছেছে, তাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় কোনো কর্মসূচি দেয়ার সক্ষমতা নেই তাদের। কারণ একে তো শফীপন্থী নেতারা অনেক আগেই হেফাজত থেকে দূরে চলে গেছেন। উল্টো সুযোগ বুঝে তারা একটি ‘আসল হেফাজত’ নামে কমিটি গঠন করতে পারেন। আবার মামুনুল ইস্যুসহ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে বর্তমান জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতে চলছে মতবিরোধ।

এর মধ্যে মামুনুল ইস্যুতে একপক্ষ চায় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার কিংবা নিজ থেকে অব্যাহতি নেয়াতে। অপরপক্ষ চায় সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে তার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে। আবার আন্দোলনের পলিসি নিয়েও চলছে বিরোধ। এই ইস্যুতে এক পক্ষ চায় আন্দোলন না করে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করতে। অপরপক্ষ চায় আন্দোলন অব্যাহত রেখে সরকারকে চাপে রাখতে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সব মিলিয়ে হেফাজতে যে দ্বিধাবিভক্তি চলছে, তার সুবিধা নিয়েছে সরকার। গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েই হেফাজতের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের গ্রেফতার ও পুরোনো মামলা সচল করা হয়েছে। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে সংঘর্ষের পর সরকার নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির করে হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতা করেছে। কিন্তু এখন হেফাজত নেতাদের ব্যাপক আগ্রহ সত্ত্বেও সরকার তাদের কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দিচ্ছে না।

আবার নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হেফাজত নেতারা নিজে থেকেও সরকারকে প্রস্তাব দিচ্ছেন না। কিন্তু বিভিন্ন বক্তব্যে তারা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে চেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন, ‘আমরা সরকারবিরোধী নই। সরকার ২০০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও আমাদের আপত্তি নেই।’

সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে হেফাজতের প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজীসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক নেতাকে কল দেয়া হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, ‘জুলুম’ থেকে প্রতিকার পেতে রোববার (১৮ এপ্রিল) হাটহাজারী মাদরাসা মসজিদে দোয়া ইউনূসের পরীক্ষিত আমল শেষে মোনাজাত করেন হেফাজত আমির জুনায়েদ বাবুনগরী।

এ সময় মাদরাসাছাত্র ও সাধারণ মুসল্লিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আলেম-ওলামাদের আটক করে রিমান্ডে নিয়ে সরকার জুলুম করছে, এই জুলুমের একদিন কঠোর বিচার হবেই।’

এদিকে মামুনুলকে গ্রেফতারের পর হেফাজতের দুর্গ চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ নগরে সতর্কাবস্থানে দেখা গেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। বিভিন্ন স্থানে পোশাকধারী পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক বলেন, ‘পুরো পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’

চট্টগ্রাম নগরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা সজাগ আছি।’

মামুনুলকে গ্রেফতারের পর রোববার পুলিশ সদরদফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়। এটিকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার আইনবিরোধী প্রতিক্রিয়া কারও দেখানো উচিত নয়। আইনের প্রতি সবার শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত। তারপরও কেউ আইন অমান্য করলে এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ, সক্ষমতা ও প্রস্তুতি পুলিশের রয়েছে।’