মি’থ্যা ত’থ্য দিয়ে জা’তীয় প’রিচয়পত্র ও পা’সপোর্ট

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারী 18, 2021 10:55:08 পূর্বাহ্ন
0
386
ভিউ

জাতীয়ঃ নিজেদের নামের পাশাপাশি মা-বাবার নামও বদল করেছেন বহুল আলোচিত তিন সহোদরের দুজন; হারিছ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ। নিজেদের ছবি দিয়ে নতুন নাম আর ভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করে তাঁরা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট করার সময় ব্যক্তিকে সশরীর হাজির থেকে ছবি তুলতে হয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হারিছ আহমেদ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট নিয়েছেন মোহাম্ম’দ হাসান নামে। আর জোসেফ নিয়েছেন তানভীর আহমেদ তানজীল নামে। এ ধরনের কাজ জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন ও পাসপোর্ট অধ্যাদেশ অনুযায়ী শা’স্তিযোগ্য অ’পরাধ। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদও একই রকম কাজ করেছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হারিছ ও জোসেফ দুটি খু’নের মা’মলায় যথাক্রমে যাবজ্জীবন ও মৃ’ত্যুদ’ণ্ডপ্রাপ্ত আ’সামি ছিলেন। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদ একটি খু’নের মা’মলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ হারিছ ও আনিসের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্ব’রা’ষ্ট্র ম’ন্ত্রণালয়। এর আগে মা রেনুজা বেগমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জোসেফের সাজা মাফ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। জোসেফ তখন কা’রাগারে ছিলেন।

সম্প্রতি কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরায় প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ তথ্যচিত্রে হারিছ ও আনিসকে প’লাতক আ’সামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশেও গত সোমবার পর্যন্ত সবাই জানত তাঁরা সাজাপ্রাপ্ত প’লাতক আ’সামি। তবে অনুসন্ধানে তাঁদের সাজা মওকুফের বি’ষয়টি বেরিয়ে আসে এবং গত মঙ্গলবার তা পত্রিকায় প্রধান প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশিত হয়।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরও এ বি’ষয়ে একই তথ্য প্রকাশ করেছে। এই তিন সহোদরের আরেক ভাই সে’নাবা’হিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনিও মঙ্গলবার তাঁর ভাইদের সাজা মাফ পাওয়ার বি’ষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। দেশের একাধিক থানা ও আ’দালতের নথিপত্র, সাজা মওকুফ চেয়ে (জোসেফের জন্য) মায়ের করা আবেদনসহ সাজা মওকুফের স’রকারি প্রজ্ঞাপনে হারিছ ও জোসেফের বাবার নাম আব্দুল ওয়াদুদ ও মায়ের নাম রেনুজা বেগম লেখা আছে। কিন্তু হারিছ যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নিয়েছেন, তাতে বাবার নাম সুলেমান স’রকার এবং মায়ের নাম রাহেলা বেগম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জোসেফের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে বাবার নাম সোলায়মান স’রকার এবং মায়ের নাম ফাতেমা বেগম লেখা আছে। দুই ভাই পৃথক পৃথক স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।

আ’দালতের নথি ও স’রকারি প্রজ্ঞাপনে হারিছ, আনিস ও জোসেফের ঠিকানা লেখা আছে ডি/৯ নূরজাহান রোড, মোহাম্ম’দপুর, ঢাকা ১২০৭। কিন্তু মোহাম্ম’দ হাসান নামে হারিছের করা জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা বলা হয়েছে মতলব উত্তর উপজে’লা, চাঁদপুর। আর বর্তমান ঠিকানা লেখা আছে বাসা নং ২৮, ডি-১ ব্লক, নূরজাহান রোড, মোহাম্ম’দপুর, ঢাকা। ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এই নামে জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করা হয়। তানভীর আহমেদ তানজীল নামে জোসেফের করা জাতীয় পরিচয়পত্রে বর্তমান ঠিকানা দেখানো হয়েছে মিরপুর ডিওএইচএসের একটি বাসা। আর স্থায়ী ঠিকানা লেখা আছে ঢাকার ক্যা’ন্টনমেন্ট বাজার এলাকার একটি বাসা।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, হারিছ ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মোহাম্ম’দ হাসান নামে ঢাকার আগারগাঁও অফিস থেকে প্রথম পাসপোর্ট করান। তাতে জরুরি যোগাযোগ: ফাতেমা বেগম, আর-২৮ নূরজাহান রোড, মোহাম্ম’দপুর উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে তিনি ভিয়েনা থেকে আবেদন করে আবার পাসপোর্ট নেন। ২০১৯ সালে তিনি পাসপোর্টে নিজের ছবি বদল করেন। ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর নামে ১০ বছর মেয়াদি একটি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর।

একই সূত্র জানায়, জোসেফ প্রথম পাসপোর্ট নেন ২০১৮ সালের ১৩ মে, তানভীর আহমেদ তানজীল নামে। তাতে স্থায়ী ঠিকানা ছিল ১২৩/এ তেজকুনীপাড়া, তেজগাঁও, ঢাকা। আর বর্তমান ঠিকানা ছিল ৪০ খানপুর, নারায়ণগঞ্জ। বৈবাহিক অবস্থা—অবিবাহিত। ওই বছরেরই ৪ জুন স্ত্রীর নাম যুক্ত করে তিনি পাসপোর্ট সংশোধন করান। ২০১৯ সালে পাসপোর্টে স্থায়ী ঠিকানা বদল করেন। ২০২০ সালের ৯ মার্চ তিনি ই-পাসপোর্ট নেন। এ সময় নিজের ছবি, স্থায়ী ঠিকানা ও জরুরি যোগাযোগের ঠিকানা পরিবর্তন করেন।

এঁদের দুজনের পাসপোর্টের বি’ষয়ে কোনো অ’ভিযোগ আসেনি। যে কেউ মি’থ্যা তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট নিলে বা এ বি’ষয়ে অ’ভিযোগ এলে তা ত’দন্ত করে অধিদপ্তর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় এবং পাসপোর্ট বাতিল করে।- সেলিনা বানু ,পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন)

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো মি’থ্যা বা বি”কৃত তথ্য দেওয়া অথবা তথ্য গো’পন করা দ’ণ্ডনীয় অ’পরাধ। এই অ’পরাধের শা’স্তি অনূর্ধ্ব এক বছর কা’রাদ’ণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদ’ণ্ড অথবা উভ’য় দ’ণ্ড। এই আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করলে বা জ্ঞাতসারে ওই জাতীয় পরিচয়পত্র বহন করলে তিনি সাত বছর কা’রাদ’ণ্ড এবং অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদ’ণ্ডে দ’ণ্ডিত হবেন।

আর পাসপোর্ট অধ্যাদেশের ১১ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মি’থ্যা তথ্য দিয়ে বা সঠিক তথ্য লুকিয়ে অন্য নামে পাসপোর্ট নিলে তা দ’ণ্ডনীয় অ’পরাধ। এই অ’পরাধের সর্বোচ্চ শা’স্তি ছয় মাসের কা’রাদ’ণ্ড বা দুই হাজার টাকা জরিমানা। জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন) সেলিনা বানু বলেন, এঁদের দুজনের পাসপোর্টের বি’ষয়ে কোনো অ’ভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, যে কেউ মি’থ্যা তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট নিলে বা এ বি’ষয়ে অ’ভিযোগ এলে তা ত’দন্ত করে অধিদপ্তর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় এবং পাসপোর্ট বাতিল করে।

জাতীয় পরিচয়পত্র করতে জন্মসনদ ও নাগরিকত্ব সনদ জমা দিতে হয়। তাতে ব্যক্তির নাম ও মা-বাবার নাম থাকে। তার ভিত্তিতেই জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যক্তিগত তথ্য যুক্ত হয়। তাই বেনামে জাতীয় পরিচয়পত্র করার ক্ষেত্রে এই দুটি সনদও অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে করতে হয়।

ইচ্ছাকৃতভাবে মি’থ্যা তথ্য দেওয়া পাসপোর্ট অধ্যাদেশ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন অনুযায়ী দ’ণ্ডনীয় অ’পরাধ। কারণ, এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি জ’ড়িত। যেসব কর্মকর্তা এ ধরনের বেআইনি কাজের সঙ্গে জ’ড়িত, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত- জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

জন্ম ও মৃ’ত্যুনিবন্ধন আইন অনুযায়ী, জন্ম বা মৃ’ত্যুনিবন্ধনের ক্ষেত্রে মি’থ্যা তথ্য দিলে অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা অনধিক এক বছর বিনাশ্রম কা’রাদ’ণ্ড অথবা উভ’য় দ’ণ্ডের বিধান আছে। আর জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ কে এম হুমায়ূন কবীর গতকাল বুধবার মুঠোফোনে বলেন, মি’থ্যা তথ্য দিয়ে হারিছ ও জোসেফের পরিচয়পত্র নেওয়াবি’ষয়ক কোনো সংবাদ তাঁর চোখে পড়েনি। এ বি’ষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

এ বি’ষয়ে কথা বলার জন্য হারিছ ও জোসেফের পাসপোর্টের আবেদন ফরমে দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে গতকাল কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। দুটি নম্বরই বন্ধ থাকায় তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে মি’থ্যা তথ্য দেওয়া পাসপোর্ট অধ্যাদেশ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন অনুযায়ী দ’ণ্ডনীয় অ’পরাধ। কারণ, এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি জ’ড়িত। তিনি বলেন, যেসব কর্মকর্তা এ ধরনের বেআইনি কাজের সঙ্গে জ’ড়িত, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।

সুত্রঃ প্রথম আলো।