ন’কল ম’দ ফ্যা’ক্টরির প্র’ধান কে’মিস্ট ভা’ঙাড়ি বি’ক্রেতা!

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারী 3, 2021 11:57:58 পূর্বাহ্ন
0
34
ভিউ

অনলাইন ডেস্কঃ জাহাঙ্গীর আলম টেনেটুনে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছিলেন। চাঁদপুর থেকে রাজধানীতে এসে একসময় পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় ভাঙাড়ির দোকানে চাকরি নেন। টোকাইদের কাছ থেকে বোতল সংগ্রহ করে তা বিক্রি করতেন। সেই জাহাঙ্গীর এখন ‘বিদেশি ম’দ’ তৈরির ফ্যাক্টরির প্রধান রসায়নবিদ (কেমিস্ট)! বিদেশে বসে নয়, রাজধানী ঢাকাতেই তৈরি করতেন নামিদামি ব্র্যান্ডের ম’দ। তার তৈরি সেই বিদেশি ম’দপানে এরই মধ্যে মা’রা গেছেন অনেকে।

সম্প্রতি ম’দপানে মৃ’ত্যুর খবরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে গো’য়েন্দা পুলিশ (ডি’বি) জাহাঙ্গীর ও নকল কারখানার মালিক নাসির আহম্মেদ ওরফে রুহুলসহ ছয়জনকে গ্রে’প্তার করলে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। ডি’বি সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীরের তৈরি নকল ম’দপান করে ঢাকায় এ পর্যন্ত ছয়জনের মৃ’ত্যুর খবর নিশ্চিত হতে পেরেছে ডি’বি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসে ঢাকা, গাজীপুর ও বগুড়ায় নকল ম’দপানে অন্তত ৩০ জনের মৃ’ত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকাতেই মা’রা যান ১২ জন।

ডি’বি কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার ভাটারার খিলবাড়ী টেক এলাকায় একটি বাড়িতে গড়ে ওঠা নাসিরের মালিকানাধীন ম’দের কথিত কারখানায় প্রধান কেমিস্ট হিসেবে কাজ করতেন জাহাঙ্গীর। কারখানাটির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন সৈয়দ আল আমিন। ওই কারখানা থেকে রেদওয়ান উল্লাহ, সাগর বেপারী ও মনোতোষ চন্দ্র অধিকারী ওরফে আকাশ পাইকারি ম’দ কিনে তা ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করতেন। সোমবার রাতে ডি’বির গুলশান বিভাগের টিম তেজগাঁও এলাকা থেকে তিন সরবরাহকারীকে গ্রে’প্তারের পর সন্ধান পায় কথিত কারখানাটির।

এরপর খিলবাড়ী টেকে অ’ভিযান চা’লিয়ে মালিক, কেমিস্টসহ ওই তিনজনকে গ্রে’প্তার করে। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ম’দ ও ম’দ তৈরির উপাদান জ’ব্দ করা হয়। ওই অ’ভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা মহানগর গো’য়েন্দা পুলিশের (ডি’বি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, সম্প্রতি ম’দপানে রাজধানীতে ছয়জনের মৃ’ত্যু হয়। এসব মৃ’ত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারেন, নকল ম’দপানে তারা মা’রা গেছেন। এরপর নকল ম’দ তৈরির কারখানা শনাক্তে গো’য়েন্দা কার্যক্রম শুরু হয়। সোমবার রাতে ভাটারা এলাকায় নকল ম’দ তৈরির কারখানার সন্ধান মেলে। ওই কারখানা সংশ্নিষ্ট ছয় সদস্যকে গ্রে’প্তার করা হয়।

ডি’বির এই কর্মকর্তা জানান, নকল ম’দ তৈরি ও বিক্রির ঘটনায় ভাটারা থানায় গ্রে’প্তার ছয়জনের বি’রুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মা’মলা হয়েছে। ওই মা’মলায় গতকাল তাদের আ’দালতের মাধ্যমে পাঁচ দিন করে রি’মান্ডে নেওয়া হয়। ম’দের নামে মূলত বি’ষ খাইয়ে এরা ছয়জনকে হ’’ত্যা করেছে। এ জন্য তাদের বি’রুদ্ধে আলাদা মা’মলা হবে।

যেভাবে তৈরি হতো নকল ম’দ :খিলবাড়ী টেক এলাকার পাঁচতলা একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলার তিনটি কক্ষে নাসির উদ্দিন গড়ে তোলেন নকল ম’দের কারখানাটি। সেখানে তারা ‘ভ্যাট সিক্সটি নাইন’, ‘পাসপোর্ট’, ‘হান্ড্রেড পাইপার্স’, ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’, ‘জেএনভি’, ‘স্যার পিটার্সম্যান’, ‘ব্ল্যাক লেভেল’, ‘সিভার্স রিগ্যাল’ ও ‘অ্যাবসলিউড’র মতো বিদেশি ব্র্যান্ডের নকল হুইস্কি ও ভদকা উৎপাদন করতেন।

কারখানাটির মালিক নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা কেরানীগঞ্জ ও মিটফোর্ড এলাকা থেকে স্পিরিট সংগ্রহ করতেন। এসব স্পিরিটে পানি ও পোড়া চিনি মিশিয়ে ম’দ তৈরি করা হতো। মিটফোর্ড ও নিমতলী এলাকা থেকে পুরোনো ম’দের বোতল সংগ্রহ করে তাতে এসব ম’দ ভরা হতো। এরপর বোতলে বিদেশি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে তা বিক্রি করতেন।

কথিত প্রধান কেমিস্ট জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঘ্রাণ ঠিক রাখার জন্য আসল ম’দ কিনে নকল ম’দের বোতলে তা সামান্য পরিমাণ দেওয়া হতো। তাদের ক্রেতা ছিলেন সাধারণ লোকজন। কম দামে বিদেশি ম’দ পেয়ে তারা কিনে নিতেন।

কেন নকল কারখানা :নকল কারখানার মালিক নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, শুরুর দিকে তিনি বিভিন্ন ওয়্যারহাউস থেকে ম’দ কিনে নানা জায়গায় সরবরাহ করতেন। সম্প্রতি ওয়্যারহাউসগুলোতে ম’দ পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু তার পরিচিত কাস্টমাররা তাকে ম’দের জন্য ফোন দিতেন। এরপরই নকল ম’দ তৈরির বি’ষয়টি তার মাথায় আসে। দুই মাস ধরে নকল ম’দ তৈরি করছিলেন তিনি।

ডি’বির এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নাসিরের কারখানা থেকে একটি ডায়েরি জ’ব্দ করা হয়েছে। তাতে তার কাছ থেকে ম’দ কেনা শত শত ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ এক সপ্তাহেই আড়ইশ ব্যক্তি তার কাছ থেকে ম’দ কিনেছেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, নকল ম’দ খেয়ে মা’রা যাওয়া নদী এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার আবদুল্লাহ আল মামুনকে নাসিরের কারখানারই ম’দ সরবরাহ করা হয়েছিল। রেদওয়ান ও আকাশ ওই ম’দ পৌঁছে দিয়েছিল। মূলত সিসিটিভি ফুটেজে তাদের দু’জনকে শনাক্তের পরই নকল কারখানাটি পাওয়া যায়।

ওই নকল কারখানা থেকে ম’দ কেনা একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, বারগুলোতে বিদেশি ম’দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পেলেও তা দামে অনেক বেশি। কিন্তু নাসির বা জাহাঙ্গীর তুলনামূলক কম দামে ম’দ সরবরাহ করতেন। তারা জানিয়েছিলেন, চোরাপথে সরাসরি ম’দ আনার কারণে তারা কম দামে তা সরবরাহ করতে পারছেন।

মিটফোর্ড হাসপাতালে ছয়জনের মৃ’ত্যু :খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে ম’দপানে ৩০ জনের মৃ’ত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকার মোহাম্ম’দপুরে দু’জন, ভাটারায় তিনজন, বারিধারা এলাকায় একজন এবং গাজীপুরে একটি রিসোর্টে ম’দপানের পর ঢাকার হাসপাতালে তিনজনের মৃ’ত্যু হয়। এ ছাড়া বগুড়ায় গত দু’দিনে ১৫ জনের মৃ’ত্যু হয়েছে। তবে সমকালের পক্ষ থেকে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে ম’দপান করে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে গত কয়েক দিনে আরও ছয়জনের মৃ’ত্যু হয়, যা এখনও পুলিশের নজরের বাইরে রয়েছে।

হাসপাতাল ও ফরেনসিক বিভাগ থেকে সংগ্রহ করা তালিকায় দেখা যায়, গত ২ জানুয়ারি মিটফোর্ড হাসপাতালে মা’রা যান জুরাইনের জসিম মিয়া ও শ্যামপুরের মো. শাওন। ৯ জানুয়ারি গাজীপুরের পুবাইল থেকে মো. মাহবুব নামের এক তরুণকে ম’দ্যপ অবস্থায় ওই হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃ’ত ঘোষণা করেন। আগের দিন একই হাসপাতালে যাত্রাবাড়ী এলাকার জুয়েল, ৪ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের সিয়াম এবং ১৭ নভেম্বর মো. মাসুদ নামের একজন মা’রা যান। তাদের হাসপাতালে ভর্তি ও মৃ’ত্যু সনদে অ্যালকোহল পয়জনিং লেখা রয়েছে।

ডি’বির ডিসি মশিউর রহমান সমকালকে জানিয়েছেন, মিটফোর্ড হাসপাতালে মৃ’ত্যুর ঘটনার বি’ষয়টি তারা অবগত নন। তবে নাসিরের কারখানা থেকে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার লোকজন ম’দ কিনত এবং তারা পৌঁছেও দিত। এসব বি’ষয়ে ওই ছয়জনকে জি’জ্ঞাসাবাদ করা হবে।