ইচ্ছে পূরণ তাহসীনের, মা’রা গেলেন ফজরের ওয়াক্তেই

স্বাধীন নিউজ ২৪.কম
প্রকাশ : জানুয়ারী 7, 2021 07:31:33 অপরাহ্ন
0
193
ভিউ

দীর্ঘদিন প্যারালাইসিস ও ব্লাড ক্যান্সারের সাথে ল’ড়াই করে অবশেষে হেরে গেলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযু’ক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী তাহসীন আহসান। বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে তার মৃ’ত্যু হয়। তাহসীন চুয়েটের সিএসই বিভাগের ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।

তাহসীনের মৃ’ত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার স্ত্রী’ তমা আলম। এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তমা জানান, ‘‘আমা’র স্বামী তাহসীন আহসান আজ ফজরের ওয়াক্তে আল্লাহর মেহমান হয়ে চলে গেছে। আপনাদের সকলের কাছে ওর মাগফিরাত কা’ মনা করে দু’আর আবেদন করছি।’’

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে অ’সুস্থ থাকার দরুন নিজের ব্যক্তিগত ভাবনাসহ নানা বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিতেন তাহসীন। ইতোমধ্যে তার বেশ কয়েকটি স্ট্যাটাস ভাই’রাল হয়েছে। এর মধ্যে গত ৭ অক্টোবর নিজের মৃ’ত্যুর পরবর্তী অবস্থা নিয়ে স্ট্যাটাসটি সর্বাধিক ভাই’রাল হয়েছে।

গত ৭ অক্টোবরের ওই স্ট্যাটাসে তাহসীন ফজরের আজান শুনতে শুনতে মৃ’ত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। তার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার স্ত্রী’ ও বন্ধুরা। নিচে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য তাহসীনের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধ’রা হলো-

মাঝে মাঝেই ইদানীং আমি চিন্তা করি, আমা’র মৃ’ত্যুর দিনটা কেমন হবে। যেদিন আমি একটা জলজ্যান্ত মানুষ থেকে ‘লা’শে’ পরিণত হব, কেমন হবে সেই দিনটা? আমা’র বাসার মাঝখানে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা আছে। আমি খুব ভাল বুঝতে পারি, লা’শটা খুব সম্ভবত সেখানেই রাখবেন সবাই। আচ্ছা, আমা’র নাকে তো একটা তুলাও গুঁজে দেওয়া হবে, তাই না? আমা’র দাদীর লা’শে আমি দেখেছিলাম ওরা তুলা ঠেসে দিয়েছিল। আমা’র মণিকাকা পরম আদরে তাঁর মায়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। অশ্রুসজল আমা’র কাকা বিড়বিড় করে শেষবারের মত মাকে কিছু বলছিলেন বোধহয়, আমি শুনতে পাই নি। আচ্ছা, আমা’র বেলায় কে হাত বুলিয়ে দেবেন?

আমা’র মনে মনে খুব ইচ্ছা আমি যেন ফজরের ওয়াক্তে আল্লাহর কাছে যেতে পারি। আধো আলো, আধো ছায়া। প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছে। না থাক। প্রচণ্ড বৃষ্টি দরকার নেই। মৃ’ত্যুর আগ মূহুর্তে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হলেও চলবে। বিরামহীন হালকা আওয়াজে বৃষ্টির শব্দের সাথে মিলিয়ে ফজরের অসাধারণ আযান সেই অদ্ভুত সময়ে কানে ভেসে আসুক, আল্লাহর কাছে আবদার।

আচ্ছা, কতদিন বৃষ্টিতে ভিজি না জানেন? প্রায় ৩ বছর হতে চলল। সিঙ্গাপুরে যখন চিকিৎসার জন্য ছিলাম, তখন সেখানে ভীষণ বৃষ্টি পড়ত। কিন্তু সেই বৃষ্টিতে ভেজার সুযোগ ছিল না। কারণ, সে সময় চিকিৎসার প্রয়োজনে আমা’র হাতে একটা সেন্ট্রাল লাইন করা ছিল যেটা হার্ট পর্যন্ত কানেক্টেড। শরীরের ঐ অংশটা আমা’র ভেজানো নিষেধ ছিল। আমি প্রায় টানা ১.৫ বছর গোসল করার সময়েও সে জায়গাটায় বিরামহীনভাবে পানি ঢালতে পারি নি। আমি বৃষ্টিতে ভেজার প্রবল নে’শা নিয়ে সিঙ্গাপুরের কুকুর- বিড়াল বৃষ্টি দেখতাম। আমা’র স্ত্রী’ আমা’র মন খা’রাপ করা মুখ দেখে চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলতেন, ‘‘আম’রা যখন সুস্থ হয়ে যাব, তখন বাংলাদেশে ফিরে যেয়ে দুইজন মিলে ধুমসে বৃষ্টিতে ভিজব, কেমন?’’ আমিও বোকার মত তার কথা মেনে নিতাম। তাছাড়া ‘সিঙ্গাপুরের বৃষ্টিটাও দেশের মত অ’ত সুন্দর না’ ভেবে মনকে বাঁধ মানানোর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

সেই আমা’র আর সুস্থ হওয়াও হল না। এখন পর্যন্ত বৃষ্টিতেও ভেজা হল না। বউমণি আমাকে এভাবে ধোঁকা দিল। হঠাৎ করে মেঘ করলে ব্যস্ত ঢাকা শহর যেমন কালো হয়ে যায়, তখন আমা’র মৃ’ত্যুর পরিবেশটা হলে বেশ হয়। বৃষ্টি আমি বড় ভালবাসি।
২.
আমা’র লা’শ টা গোসল দেওয়ার পর যখন মেঝেতে পাটির উপর রাখা হবে, প্রচণ্ড জাগতিক ব্যস্ততাও থাকবে নিশ্চয়ই। সবাইকে জানানো। ম’রা বাড়িতে ঘনিষ্ঠ – অঘনিষ্ঠ আত্মীয় – স্বজন যেই আসুক, সবাইকে কিছুটা হাসিমুখে রিসিভও করতে হয়। আমা’র যারা ভাই আছেন তাঁদের ঘাড়ে নিশ্চয়ই এই দায়িত্বটা পড়বে। আমা’র অনেক গুলো ভাই। আমি জানি আমি যেদিন চলে যাব এরা কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে আড়ালে আড়ালে কাঁদবেন। আবার কাঁদার ফাঁকে ফাঁকে সবাইকে একটু হলেও বসাবেন। গ্রীট করবেন। আত্মীয়রা একটু লা’শটা দেখতে চাইবেন নিশ্চয়ই। শেষ দেখা। আমা’র ভাই’রা কাফন খুলে দেখাবেন।

আমি কল্পনায় পরিস্কার দেখতে পাই, আমা’র বোন আর স্ত্রী’ গলাগলি করে সেদিন খুব কাঁদছেন। আমা’র বোনের কথা আপনাদের প্রায় কোন লেখাতেই বলা হয় নি। আমা’র বোনটা আমা’র চেয়ে ৬ বছরের ছোট। ওর জন্ম হওয়ার ১৫/২০ দিনের মা’থাতেই আমা’র মাকে আবার অফিসে জয়েন করতে হয়। আমাদের তখন কঠিন জীবন সংগ্রাম। আমি তখন আমাদের পুরনো ঢাকার সেই দোতালার ভাড়া বাসায় কাজের লোক চায়না আপার আন্ডারে সারাদিন থাকি। খুবই নিরুত্তাপ দিন কাটে। ও হওয়ায় আমা’র বেশ ভাল সময় কাঁ’টার উপলক্ষ হয়।

কী’ সুন্দর একটা বাচ্চা! আমা’র বোনটা হওয়ার পর এত্ত ট’কট’কে লাল ফর্সা ছিল যে সবাই ওর নাম দিয়েছিল জা’পানি ডল। আর মা’থাভর্তি কী’ চুল!! ঘন চুল। আমি অ’বাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। চায়না আপার কাছ থেকে টাম্বলার কেড়ে নিয়ে ওকে খাওয়াতাম। ও যখন ঘুমিয়ে থাকত, ওর পাশে শুয়ে থাকতাম। শুধু অ’পেক্ষা করতাম, ও কখন ঘুম থেকে উঠবে! কিন্তু ও বেয়াড়ার মত প্রায় সারাদিনই ঘুমাত। ওর নীরবতা আমা’র অসহ্য মনে হত। অস্থির হয়ে যেতাম। আমি সে সময়ে আবেগ – অনুভূতির ব্যাপার গুলো সঙ্গত কারণেই বুঝতাম না কিন্তু সারাক্ষণ মনে হত ওকে জড়িয়ে ধরে থাকি। আমা’র বোন সেই ছোট্ট নিলোপলার চেয়ে সুন্দর কিছু আমি তখন পর্যন্ত আর দেখি নি। আসলে এখন পর্যন্তও দেখি নি। আমা’র কোলে করে ওকে বড় করেছি। কত ভাল যে আমি ওকে বাসি ও তার কিছুই তখন বুঝত না। এখনো বোঝে বলে মনে হয় না।

আমা’র সেই বোনটা আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। জানি না, আমি যেদিন মা’রা যাব তার আগেই ওর বিয়ে হয়ে যাবে কিনা। আমি কি দেখে যেতে পারব ও নতুন জীবন শুরু করেছে? অবশ্য আমি দুরতম স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না আমা’র নিলোপলার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আমি “নিলোপলা’ বলে ডাকব আর ওকে ঘরে দেখতে পাব না, কেউ “ভাইয়া” বলে ডাক শুনবে না, এই পরিস্থিতি কল্পনা করতেও আমা’র চোখে পানি চলে আসে। আমা’র নিলোপলার বিয়ে হয়ে যাবে, ভাবা যায় না। আমি জানি আমা’র লা’শ সবাই যখন মুখ খুলে খুলে দেখবে, আমা’র বোনটা খুব কাঁদবে। খুবই কাঁদবে৷ জানেন? ওকে আমি ভ’য়ংকর ধরণের ভালবাসি।

আমা’র মৃ’ত্যুর দিন আমা’র দৃঢ় বিশ্বা’স আমা’র স্ত্রী’ অ’জ্ঞান হয়ে যাবেন। মে’য়েটা খুব বেশি শারীরিক ধকল নিতে পারে না। সেদিন পারার প্রশ্নই আসে না। মনের গভীর দুঃখ থেকে যেই কা’ন্না আসে সেটা আমা’র স্ত্রী’র ব্রেনের জন্য খুব বেশি ক্ষতিকারক হবে। কাঁদতে কাঁদতে সে হুঁশে নাও থাকতে পারে। এই মানুষটা যে কী’ ভীষণ বিশ্বা’স করে, এই ক্যান্সার আমা’র কিছু করতে পারবে না, আমি সম্পূর্ণ ভাল হয়ে যাব! সে আমাকে নিয়ে কত শত ছে’লেমানুষী পরিকল্পনা যে করে ভাবতে পারবেন না। তার খুব স্বপ্ন একটা ফাউন্ডেশন করবে। যেটা টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না, এমন মানুষদের নিয়ে কাজ করবে। সেটার একটা বিজনেস উইং ও থাকবে। থাইল্যান্ড / চায়না থেকে সেই উইং প্রোডাক্ট ইম্পোর্ট করবে। একটা বড় ই – কমা’র্স জাতীয় কিছু হবে। আমি আবার সেই পুরনো দিনের মত সফটওয়ার টা বানিয়ে দিব। ফাউন্ডেশনের নাম হবে ” আশাবরী”.। ভাবুন তো, এত ছে’লেমানুষ ও কেউ হয়।

সেই বৃষ্টি ভেজা দিনে আমা’র লা’শ দেখে তাঁর এই স্বপ্ন গুলো ভেঙে না যায়, এটাই আমা’র ইচ্ছা। সে বাঁচুক। আশাবরী ফাউন্ডেশন হোক। কোন সহৃদয়বান পুরুষ এসে তার হাত ধরুক। তাঁকে বলুক। ‘‘এই তো, আমি পাশে আছি, কে বলল তুমি একা?’’। সে ভাল থাকুক। তার স্বপ্ন পূরণ হোক। তার কোলজুড়ে আসুক নতুন দিনের নতুন সন্তান। আমা’র সাথে সুখ হল না তো কি হয়েছে? সে ভাল থাকুক। সুখে থাকুক। আমা’র সাথে বিয়ে হয়ে তার জীবনের শুরুটা বড় ক’ষ্টে কাটল। বাকী’টা তার সুখে কাঁটুক। সর্বোচ্চ আনন্দে কাটুক। আল্লাহ যেন তাকে সব দেন।

আমা’র মৃ’ত্যুর দিন আমাকে শেষ দেখা দেখতে এসে বিব্রত হবেন আসলে আমা’র হাতে গোণা কিছু বন্ধু বান্ধব। এরা এসে বুঝতেও পারবেন না, কোথায় বসবেন, কোথায় দাঁড়াবেন। এদের তো কেউ আত্মীয়দের মত আন্তরিকতার সাথে ডেকে ঘরে বসাবেন না। এরা কাউকে লা’শ দেখতে চাই বলতেও পারবেন না। আবার লা’শ না দেখে বাড়িও ফিরতে পারবেন না। খাটিয়া দিয়ে যখন গ্যারেজে নামিয়ে নেওয়া হবে, তখনই একমাত্র সুযোগ। আমা’র যারা আসলেই ঘনিষ্ঠ ধরণের বন্ধু এরা একটু ইন্ট্রোভা” র্ট প্রকৃতির। এরা হয়তো নিঃশব্দে আমা’র লা’শের খাঁটিয়াটা ঘাড়ে তুলে নেবেন, কিন্তু কাউকে মুখ ফুঁটে বলতে পারবেননা, “একটু দেখি তো ভাই”।

আমা’র খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই আমা’র মৃ’ত্যুর দিন আমাকে দেখতে আসতে পারবেন না। একটা সময় ছিল, আম’রা বন্ধু – বান্ধবরা যখন এলাকায় সেলিমের চায়ের দোকানে এক সাথে বসতাম, আর কেউ বসার জায়গা পেত না। ১৫/২০ জন মিলে হৈহৈ। জীবনের প্রয়োজনে, খুব আশ্চর্য শোনালেও সত্য, এলাকায় আর এখন কেউই থাকেনা। সবাই বিদেশে সেটল করেছেন বা করার প্রসেসে আছেন। একদম সবাই। এলাকায় পড়ে ছিলাম শুধু আমি একা। সুতরাং আমা’র সাথে তাঁদের কারোরই শেষ দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ভাবতে কেমন যেন লাগে। যাদের সাথে জীবনের এত সময় কাঁটিয়েছি, একদিন বাদে পরেরদিন দেখা না হলে মনে হত, কতকাল দেখা হয় নি, তাদের সাথে শেষ দেখা হওয়ার সম্ভাবনাটাও হিসেব করতে হচ্ছে৷

লোকে বলে, পৃথিবীতে নাকি সবচেয়ে ভা” রী বস্তু হল পিতার কাঁধে সন্তানের লা’শ। সেদিন আমা’র বাবাকে এই অ’ভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে হবে ভাবতেই খা’রাপ লাগছে। আমা’র বাবার পায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা। উনি স্মুথলি হাঁটতে পারেন না। আর্থ্রাইটিসের কারণে। আমা’র চিকিৎসা চলাকালীন হার্ট অ্যাটাকও করেছিলেন। সেই খবর তারা আমা’র কাছে তখন গোপণ করেছিলেন। তার রিংও পরানো আছে। কিন্তু কি আর করা, একমাত্র ছে’লে যেহেতু তাঁদের দেখভাল করতে অক্ষম ছিল তাই তাঁর এই খোঁড়া পা নিয়েই জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোর বেলা অফিস করতে বের হয়ে যেতে হয়।

আমা’র বাবা, আমি যখন সুস্থ ছিলাম তখন বলতেন, ‘‘২০২১ সালের পর আর কাজ করব না। কমপ্লিট রিটায়ার। সারাদিন বাসায় শুয়ে থাকব।’’

আমিও তাগিদ দিয়ে বলতাম, ‘‘তোমাকে ইন শা আল্লাহ আর কিছু করতেও হবে না আব্বা। আম’রা সব সামলতে পারব। একটা ফ্ল্যাট ভাড়া আছে। আমি চাকরি করব, আউটসোর্সিং করব (সুস্থ থাকার সময় করতাম কিন্তু), ব্যবসা করব, তমা(আমা’র স্ত্রী’) কিছু একটা করবে। ইন শা আল্লাহ সব হয়ে যাবে।’’

কি কথা ছিল, আর কি হল বলেন তো? আমা’র চিকিৎসার জন্য সেই ফ্ল্যাটটাও বেঁচে দিতে হল৷ আর আমি তো আমিই। একটা বিকলাঙ্গ বোঝা হয়ে বেঁচে ছিলাম, যতদিন ছিলাম। আমা’র বাবার সাধের ২০২১ সালের রিটায়ারমেন্টটা আর আসল না। আল্লাহর ফয়সালা। যা আছে আলহাম’দুলিল্লাহ।

খোঁড়া পায়ে বাবাকে এখনও অফিসে দৌড়াতে হয়, বাজার করতে হয়। মাঝে মাঝেই হাঁটতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যেতে হয়। আমা’র বাবা অবশ্য এসব কথা বার্তা একদমই আমলে নেন না। তার মত এরকম আবেগী মানুষ আমি আর দেখি নি। আমা’র ভিতরে যতটুকু আবেগ, পুরোটাই আমা’র বাবার কাছ থেকে পাওয়া। আমা’র ও নিলোপলার প্রতি তার আবেগের তীব্রতা এত বেশি সেটা বোঝানো কঠিন। আমাদের কে শুধু চোখের দেখা দেখতে পারলেও তার চোখ চকচক করে। তার সামনে বসে থাকলেও কতবার যে আমাদের নাম ধরে ডাকেন! কতবার যে গায়ে হাত বুলিয়ে দেন! আমি জানি না আমা’র নিঃস্পন্দ লা’শের গায়ে যখন তিনি হাত বুলাবেন, তখন তার কেমন লাগবে!! আমি জানি না। সত্যিই জানি না।

৩. আমা’র খুব ইচ্ছা আমা’র কবর আমা’র দাদা বাড়ির কবরস্থান এ দাদার পাশেই দেওয়া হোক। দাদাকে যেদিন কবর দেওয়া হয় সেসময় আমা’র বয়স ১০/১১। আমা’র মনে আছে আমি জীবনে প্রথমবারের মত কবর খোঁড়া দেখছি৷ আমা’র দাদার লিভা” র ক্যান্সার হয়েছিল। ঢাকা থেকে লা’শ বাড়িতে আনতে আনতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমাদের বাড়ির কবরস্থানে তিন – চার জন লোক কবর খোঁড়ার আয়োজনে। হ্যাজাক লাইট জালানো হয়েছে। বেশ দ্রুত কাজটা এগিয়ে যাচ্ছে। আমা’র দেখতে বেশ লাগছে। কবর খুঁড়তে খুঁড়তে যখন গভীর হয়ে গেল, তখন আমা’র কেমন যেন অস্বস্তি লেগে উঠল। এত গভীর করছে কেন? এত নীচে দাদাকে ফেলে দিবে? এটা কেমন কথা? ফেলে দিয়ে আবার চাপা দিয়ে দিবে। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্তও কবর খোঁড়াটা আমা’র কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হলেও কবরের গভীরতা দেখে আর ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছিল না। কেমন ভ’য়ংকর একটা কালো ধরণের গর্ত। এখানে মানুষকে ফেলে দেওয়া হয়, তারপর চাপা দিয়ে চুপচাপ চলে আসা হয়। দাদাকে আর দুনিয়াতে কোনদিনও যে দেখা যাবে না, সেই সময় আমা’র প্রথম মনে হয়।

আমা’র লা’শের জন্যও সেইরকমই একটা গর্ত খোঁড়া হবে নিশ্চয়ই। তারপর ফেলে দেওয়া হবে, তারপর চাপা দিয়ে চুপচাপ চলে আসা হবে। এই দুনিয়ায় আর কোনদিন দেখা হবে না।

আমা’র এই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নিশ্চয়ই কেউ স্ট্যাটাস দিয়ে দেবেন যে আমি আর নেই। আমা’র যারা আধা – পরিচিত, পরিচিত বা অ’পরিচিত মানুষ আছেন, তারা জেনে যাবেন যে তাসনীম আহসান আর বেঁচে নেই। মা’মলা ঢিসমিস, ডান্ডি ফট্টাস। ভা” র্সিটির যেসব বন্ধুদের সাথে আর দেখা হয় নি, বা যোগাযোগ থাকে নি তারা মুখ দিয়ে একটু চুকচুক করবেন। আমা’র মৃ’ত্যুর খবর দেওয়া স্ট্যাটাসে ইন্না-লিল্লাহ লিখবেন।
এইতো।

৪.আমি এখন মোটামুটি সম্পূর্ণই বিছানায় পড়ে গেছি। হাত – পা কাজ করতে চায় না। প্রতি মাসেই হাসপাতা’লে ভর্তি হতে হয়। বিচ্ছিরি সব হাই ডোজ কেমোথেরাপি নিতে হয়। চোখেও ভাল দেখি না। বইপত্র পড়তে ক’ষ্ট হয়। চোখ দিয়ে পানি পড়ে।

তাই আমা’র সময় কা’টানোর জন্য আমি প্রায়ই একটা কাজ করি। আমা’র অ’সুস্থতা নিয়ে লেখা পুরনো পোস্টগুলো পড়ি। ঐ সময়টাকে মনে করি। আপনাদের কমেন্টের অ্যাপ্রিসিয়েশন গুলো দেখি। আপনাদের দুয়া গু’লি দেখি। প্রায়ই চোখ ভিজে যায়। দুনিয়ার মায়ায় পড়ে যাই। আপনজনদের ছেড়ে ম’রে যেতে ইচ্ছা করে না। ইচ্ছা করে, সবাইকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে বাঁচি।

আমা’র মাকে জড়িয়ে ধরে বলি, আমি ভাল হয়ে গেছি মা। আমা’র রোগ সেরে গেছে। আমা’র স্ত্রী’কে বলি চল, আম’রা বাঁচি। ভরপুর করে। আল্লাহ পৃথিবীতে যেই নেয়ামত দিয়েছেন, তা উপভোগ করি। লেটস মেক এ ফ্যামিলি। লেটস স্টার্ট ফ্রেশ! বাবাকে বলি, আব্বা, তোমাকে আর ক্লিনিকে যেতে হবে না। আর সাত সকালে অফিসেও যেতে হবে না। আমি আছি না?? আমা’র ছোট বোনটাকে বলি, “কিরে, তোর পছন্দের কেউ আছে নাকি? থাকলে তোর ভাবীকে বল”। নিলোপলার বিয়ের দিন সুস্থভাবে নিজের পায়ে দাড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে ইচ্ছা করে। হয়তো ওর দামী মেক আপ নষ্ট হয়ে যাবে। সে হোক।

খুব ইচ্ছা করে, জানেন? খুব।

কিন্তু ইচ্ছা করলেই সমস্ত হবে, এমন না।

সেটা জরুরী নয়।

যে যা পায়, সেটাই তার জন্য শোভন ও সুন্দর। আল্লাহ তা’লা কাউকে ঠকান না।

আল্লাহ তা’লা আমা’র মনের অস্থিরতা দুর করুক। সমস্ত গুণাহ মাফ করে দিক।

শহিদী মৃ’ত্যু দান করুক।

মৃ’ত্যুর মূহুর্তে যেন আজরাঈল আলাইহিস সালাম অ’ভিবাদন দিয়ে আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যান। আসমানের বাসিন্দারা যেন আমা’র রুহকে হাসতে হাসতে স্বাগত জানান।

আল্লাহ কবুল করুক।

আমাকে মোনাজাত মনে রাখবেন।

দুয়ার দরখাস্ত।